
কুমিল্লা প্রতিনিধি
* জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন
* পুলিশ হেফাজতে তুহিন
* আইফোন ঘিরে রহস্য
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, ঘটনার দিন বিকেল থেকে অপ্রতিমের সাথে থাকা তুহিন নামে এক যুবকও পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তবে তদন্তের এ পর্যায়ে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সাথে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। নিখোঁজ হওয়ার সময় সাথে থাকা মায়ের আইফোনটি এখনো উদ্ধার হয়নি। ফলে আইফোনটি হত্যাকাণ্ডের কারণ নাকি ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল- তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন রহস্য।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো: আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক দল ঘটনাটি নিয়ে কাজ করছে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্লু পাওয়া গেছে। হত্যার পেছনে শুধু আইফোন ছিল নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা দ্রুত উদ্ঘাটন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে যতজনই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিখোঁজ
পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ির বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। বন্ধুদের সাথে ছবি তোলার কথা ছিল তার। এর পর থেকেই তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে শুরু করেন। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। অপ্রতিমকে উদ্ধারে পুলিশসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা মাঠে নামেন। কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান মেলেনি।
শনিবার দুপুরে কোটবাড়ির দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে জঙ্গলের ভেতর তার লাশ পাওয়া যায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি কিশোরের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জঙ্গলে যেভাবে মিলল লাশ
অপ্রতিমের লাশ প্রথম দেখতে পান আবদুল কাদের জিলানী। তিনি জানান, বাঁশ কাটতে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে লাশটি দেখতে পান তারা। দূর থেকে প্রথমে মনে হয়েছিল কেউ হয়তো সেখানে ঘুমিয়ে আছে। কাছে গিয়ে মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান।
পরে মামুন নামে একজনকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি অপ্রতিমের বলে শনাক্ত করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ ও আঘাতের ধরন সম্পর্কে আরো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তুহিনকে ঘিরে তদন্ত
ঘটনার তদন্তে অপ্রতিমের শেষ সময়ের গতিবিধি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একাধিক সূত্রের দাবি, ঘটনার দিন বিকেল থেকে তুহিন নামে এক যুবক অপ্রতিমের সাথে ছিলেন। পরে তাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে পুলিশ এখনো তুহিনকে হত্যাকাণ্ডের আসামি হিসেবে ঘোষণা করেনি। তাকে কেন হেফাজতে নেয়া হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে কার কার সাথে যোগাযোগ করেছে, কোথায় গিয়েছিল এবং শেষবার কার সাথে তাকে দেখা গেছে- এসব তথ্য যাচাই করছেন। একই সাথে আশপাশের এলাকার সম্ভাব্য সাক্ষী ও অন্যান্য তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
আইফোনই কি হত্যার কারণ?
এই হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে মায়ের আইফোনটি। অপ্রতিম যে আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল, সেটি এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশের কাছেও প্রশ্ন- ফোনটি ছিনিয়ে নেয়ার জন্যই কি তাকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি ফোনটি হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে অন্য দিকে নেয়ার একটি উপাদান?
পুলিশ সুপারের বক্তব্যেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু আইফোন ছিল কিনা, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল তা তদন্ত করে বের করা হবে।
ফলে ফোনটির অবস্থান, ফোনটির শেষ ব্যবহার, নিখোঁজ হওয়ার সময় অপ্রতিমের সাথে কারা যোগাযোগ করেছিল এবং ঘটনার আগে-পরে তার অবস্থান- এসব তথ্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
জীবিত উদ্ধারের চেষ্টা, শেষ রক্ষা হয়নি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারে পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, অপ্রতিমের সাথে থাকা মায়ের আইফোনটিও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
অপ্রতিম বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার এবং মা ড. নাহিদা বেগম- দু’জনই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত। শিক্ষক দম্পতির একমাত্র সন্তানকে এভাবে হারানোর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।
এ দিকে পুলিশের একাধিক দল তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার সময় থেকে লাশ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তার গতিবিধি, তার সাথে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়, আইফোনের অবস্থান এবং হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- সব দিক সামনে রেখে তদন্ত এগোচ্ছে। পুলিশ বলছে, তদন্তে পাওয়া ক্লুগুলো যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা দ্রুত উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
বিচার চাই না জবাব চাই, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে : অপ্রতিমের মা
‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন, আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি এটার জবাব চাই?’
ছেলে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধারের পর এভাবেই বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) অপ্রতিমের বাসায় যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় ছেলেকে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েন নাহিদা বেগম।
নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না, আমাকে এর উত্তর দিতে হবে। আমার ছোট্ট একটা ছেলে, সে কী অন্যায় করেছে। তার কী অন্যায় ছিল, আমি শুধু জানতে চাই। এটা কোন দেশ?’
এরপর ছেলেকে হারিয়ে কিভাবে জীবন কাটাবেন, সেই অসহায়ত্বের কথাও বলতে থাকেন তিনি। বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার তো একটাই ছেলে। আমি কেমনে আমার জীবন কাটাব? আমি আমার জীবন পার করব কেমনে? আমারে একটু সবাই বলেন, আমি আমার জীবনটা পার করব কেমনে।’
মায়ের এসব কথা শুনে মনিরুল হক চৌধুরীও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।’
ছেলের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে অপ্রতিমের বাবা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ে এসে ছেলেকে খাওয়ান তিনি। এরপর তাকে বলেছিলেন, বাবা তুমি থাকো, আজ দু’জনে মিলে মুভি দেখি। মুভি শেষে তাকে একটি গিফট দেয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু অপ্রতিম বন্ধুদের সাথে ছবি তুলতে বাইরে যাওয়ার কথা জানায়। এরপর সে বাইরে চলে যায়।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, ‘আমাদের একটাই ছেলে। অন্যায় করলে ওরে মেরে ফেল, অন্যায় করে নাই। ওর ফোন নিয়ে... ফোনটা নেয়ার জন্য ওকে মেরে ফেললো, এটা কী হলো?’
ছেলেকে হারানোর পর কিভাবে তার মুখের দিকে তাকাবেন, সেই কষ্টের কথাও বলেন তিনি। অপ্রতিমের বাবা জানান, ছেলে নিয়মিত নামাজ পড়ত এবং বন্ধুদের সাথে নামাজ পড়তে যেত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








