
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
* ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন বিশেষ সুবিধা, পাসের হারও বেশি
* বিজ্ঞান ইউনিটেও আলাদা প্রশ্নপত্র, সমতার প্রশ্ন
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা, কিন্তু পরীক্ষার মাপকাঠি ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা ইনস্টিটিউটে ভর্তি পরীক্ষা এই নিয়মে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সাধারণ কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের তুলনায় ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা কম বিষয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। প্রশ্নের কাঠামোতেও রয়েছে পার্থক্য। শুধু তা-ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বলছে, ব্যবসা শিক্ষা ইনস্টিটিউটে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণের হার অন্যান্য ইউনিটের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে এ ব্যবস্থা চালু থাকলেও এবার বিজ্ঞান ইউনিটেও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে ভর্তি পরীক্ষায় সবার জন্য অভিন্ন মাপকাঠি থাকা উচিত কিনা তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-সংক্রান্ত তথ্য ও বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের নির্দেশিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে সাধারণ কারিকুলামের ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীদের এমসিকিউ অংশে বাংলা, ইংরেজি, হিসাববিজ্ঞান এবং ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা এই চারটি বিষয় বাধ্যতামূলক। এর সাথে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন অথবা ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বীমার মধ্যে একটি বিষয় বেছে নিতে হয়। অর্থাৎ তাদের মোট পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়।
অন্য দিকে এ লেভেল বা সমমানের শিক্ষার্থীদের এমসিকিউ অংশে ইংরেজি ও অ্যাডভান্সড ইংরেজির পাশাপাশি বিজনেস স্টাডিজ, অ্যাকাউন্টিং, ইকোনমিকস ও ম্যাথমেটিকসের মধ্যে যেকোনো দু’টি বিষয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের মোট চারটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়।
অর্থাৎ সাধারণ কারিকুলামের শিক্ষার্থীদের যেখানে পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়, সেখানে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেন চারটি বিষয়ে। আবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা বিষয়টি বাধ্যতামূলক হলেও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এর পরিবর্তে রাখা হয়েছে অ্যাডভান্সড ইংরেজি।
শুধু বিষয়সংখ্যাতেই নয়, প্রশ্নের কাঠামোতেও পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের এ লেভেল পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন কাঠামোর উদাহরণে ইংরেজি, অ্যাডভান্সড ইংরেজি ও ব্যবসায় শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ের পৃথক অংশ দেখা যায়। লিখিত অংশে ছিল রচনা, ভুল সংশোধনসহ ব্যবসায় শিক্ষাসংক্রান্ত প্রশ্ন।
পাসের হারেও বড় পার্থক্য
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কাঠামোর সাথে উত্তীর্ণের হারেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে পাওয়া বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্যান্য ইউনিটে ইংরেজি মাধ্যমের আবেদনকারীদের উত্তীর্ণের হার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে তা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ অন্য ইউনিটগুলোর তুলনায় ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ইংরেজি মাধ্যমের আবেদনকারীদের উত্তীর্ণের হার কয়েক গুণ বেশি।
তবে এই পার্থক্য শুধু আলাদা প্রশ্নপত্রের কারণে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য নেই। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক প্রস্তুতি, আবেদনকারীর সংখ্যা, বিষয় নির্বাচন, পূর্ববর্তী শিক্ষাগত ফলাফল এবং তাদের কারিকুলামের পার্থক্যও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে উত্তীর্ণের হারের ব্যবধানকে পৃথক প্রশ্ন কাঠামোর সরাসরি ফল হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ১ হাজার ৫০টি আসনের বিপরীতে ৩৪ হাজার ৬২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। অর্থাৎ প্রতি আসনের বিপরীতে পরীক্ষার্থী ছিলেন প্রায় ৩২ জন।
দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এই আলাদা ব্যবস্থা
ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ইংরেজি মাধ্যমের জন্য আলাদা প্রশ্ন কাঠামো নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়, অন্তত ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নির্দেশিকাতেও এ ব্যবস্থা ছিল। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষেও তা বহাল ছিল।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিজ্ঞান ইউনিটে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র চালুর উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম জানিয়েছিলেন, ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য এমন ব্যবস্থা আগে থেকেই রয়েছে। সেখানে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বাংলার পরিবর্তে অ্যাডভান্সড ইংরেজির প্রশ্ন দেন আর পরীক্ষার অন্যান্য অংশ একই থাকে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞান ইউনিটেও আলাদা প্রশ্ন
এবার ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের বাইরে বিজ্ঞান ইউনিটেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। ২ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ভর্তি কমিটির সভায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান ইউনিটে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম অনুযায়ী আলাদা প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের যুক্তি, ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রম জাতীয় কারিকুলাম থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। ফলে সেই কারিকুলাম অনুসরণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশ্নপত্রে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, কারিকুলামের পার্থক্যের কারণে অনেক ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার দিকে যায়। তবে এই যুক্তির বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষার সমতার প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্র করা ঠিক হবে না। ভর্তি পরীক্ষা একটি হওয়া উচিত।
তার মতে, দুই মাধ্যমের পাঠ্যক্রম আলাদা হলেও প্রশ্ন পাঠ্যক্রমভিত্তিক না হয়ে যোগ্যতাভিত্তিক হওয়া উচিত। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী কী শেখার কথা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য তার কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন পরীক্ষায় সেটিই যাচাই করা দরকার।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজির মৌলিক বিষয়গুলো শেখে। তাই তাদের জন্য আলাদা প্রশ্ন করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে একই প্রশ্নের বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ রাখা যেতে পারে।
আলাদা প্রশ্নপত্র চালু হলে কোন মাধ্যমের প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন বা সহজ হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। একইভাবে মাদরাসা, কারিগরি এবং ক্যামব্রিজ বা এডেক্সেলের মতো বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের জন্যও আলাদা প্রশ্নের দাবি উঠতে পারে। এতে ভর্তি পরীক্ষা আরো জটিল হয়ে পড়বে বলে তার মত।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘বহু বছর ধরে এ কাঠামোতেই প্রশ্নপত্র হয়ে আসছে। এ বিষয়ে কারোর কোনো অভিযোগ বা আপত্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








