ইসরাইলের নির্বাচন, আরব দলগুলো,  কিং মেকার,
গাদি আইজেনকট পতাকা দোলাচ্ছেন। আল জাজিরা

 ইসরাইলের পার্লামেন্টে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো এবার রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে পারে। নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের এই আভাস সত্য হয়েছে। তবে এ সত্য উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের জন্য। তবে আসনসংখ্যায় শক্তি বাড়লেও সরকার গঠনে আরব দলগুলো শেষ পর্যন্ত 'কিং মেকারের' ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

Advertisement

ইসরাইলের নির্বাচনে আরব ভোটের উত্থান ও পুনরুজ্জীবনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশটির সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেক। আল জাজিরা বুধবার (২৮ অক্টোবর) জানায়, তিনি বলেছেন, ‘বার্তাটি স্পষ্ট। ইসরাইলের রাজনীতির হিসাব-নিকাশে এত বড় একটি ভোটার জনগোষ্ঠীকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।’

মঙ্গলবারের ভোটের বুথফেরত জরিপের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম দল দুটি মিলে ১২০ আসনের নেসেটে ১৭টি আসন পেতে পারে। আংশিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট ৫৪টি এবং গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯টি আসন পেয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

হিসাব অনুযায়ী, আইজেনকটের জোট আরব দলগুলোর সাথে হাত মেলালে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন ছাড়িয়ে যেতে পারে। টাইমস অব ইসরাইল-এর হিসাবে, এই দুই পক্ষ এক হলে তাদের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৬৬-তে। তাতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পথ খুলতে পারে।

কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাস্তবে আরব দলগুলো এখনো 'কিং মেকার' বা ‘নির্ণায়ক শক্তি’ হয়ে উঠতে পারেনি। ইসরাইলের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সাথে সরকার গঠনে আপত্তি জানায়। রামাল্লায় অবস্থিত ফিলিস্তিনিয়ান ফোরাম ফর ইসরাইলি স্টাডিজের মহাপরিচালক হোনাইদা গানাম এই বাধাকে বর্ণনা করেছেন বর্ণবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর ফল হিসেবে। তাঁর ভাষায়, এই কাঠামোয় আরব নাগরিকদের অবৈধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখা হয়।

নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুজনই অভিন্ন মূল্যবোধের অভাবের কথা বলে আরব দলগুলোর সাথে জোটের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।

জোট গঠনের সম্ভাবনা কতটা?

ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজ্জারের মতে, আরব দলগুলোর সাথে জোট গঠন শুধু সম্ভবই নয়, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আইজেনকটের জন্য এটিই হতে পারে একমাত্র ‘বাস্তবসম্মত’ পথ। কিন্তু তাঁর আপত্তির কারণ আদর্শগত। নাজ্জার বলেন, নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী আরব দলগুলোর সমর্থন অপরিহার্য হলেও আইজেনকট তাদের প্রতি আনুগত্যের শর্ত আরোপ করেছেন এবং তাদের ওপর নির্ভর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস অবশ্য আইজেনকট সরকার গঠন করলে তাতে যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। শর্ত হলো, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামলানোর দায়িত্ব থাকবে আরব দলটির হাতে। রা’আমের নির্বাচনী তালিকায় ইহুদি আইনপ্রণেতা ইয়োভ সেগালোভিটজকে দ্বিতীয় স্থানে রাখার কথাও উল্লেখ করেছেন প্যালথিংক ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক ওমর শাবান। তাঁর মতে, এমন সহযোগিতা ফিলিস্তিনি ও ইহুদি নাগরিকদের সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।

বুধবার জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনও নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। ইদিওত আহরোনোত পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সরকার প্রত্যেক আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।’ তাঁর দল নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি কাজে লাগিয়ে মূল্যবোধ এগিয়ে নেবে বলেও জানান তিনি।

জয়েন্ট লিস্টের আরেক নেতা আহমেদ তিবিও বিরোধী জোটের প্রতি নেতানিয়াহুকে সরাতে হাত বাড়ানোর কথা বলেছেন। তবে আরব দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারে যোগ দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

শাবানের মতে, ইসরাইলি সমাজের কট্টর অংশের বিরোধিতা এ ক্ষেত্রে বড় বাধা। তারা চায় না, আরব ভোটের ওপর নির্ভর করে কোনো সরকার গঠিত হোক। নাজ্জার মনে করেন, আইজেনকটকে নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যানের মতো সম্ভাব্য মিত্রদেরও রাজি করাতে হবে। এর জন্য ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটাধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকার পরিচালনার বৈধ অংশীদার হিসেবে মেনে নিতে হবে।

হোনাইদা গানাম সম্ভাব্য চারটি পরিস্থিতির কথা বলেছেন—নতুন নির্বাচন, আরব দলগুলোর বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে বিরোধীদের সংখ্যালঘু সরকার, বিরোধী শিবির থেকে নেতানিয়াহুর জোটে সদস্যদের যোগ দেয়া অথবা জাতীয় ঐক্যের সরকার। তবে তাঁর মতে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো নেতানিয়াহুর শিবিরের দৃঢ়তা ও সংহতি।

জোটের শর্ত কী?

টাইমস অব ইসরাইল-এর তথ্য অনুযায়ী, আইজেনকট বলেছেন, ইসরাইলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ মেনে চলে এবং সব ইসরাইলির জাতীয় সেবায় অংশগ্রহণের অঙ্গীকার করে—এমন যেকোনো দলের সাথে তিনি জোটের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। তবে রা’আম, কিংবা সেগালোভিটজকে সাথে নিয়ে রা’আম, এসব শর্ত পূরণ করে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি।

ইসরাইলে ইহুদি ও আরব দলগুলোর একসাথে সরকার গঠনের নজির রয়েছে। সর্বশেষ ২০২১ সালের নির্বাচনের পর রা’আম সম্ভাব্য নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠেছিল। দলটির সমর্থনেই বেনেট-ইয়ার লাপিদের স্বল্পস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। নাজ্জার বলেন, ২০২১-২২ সালের জোটে রা’আম অংশ নিয়েছিল। এর আগেও আরব দলগুলো বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ইয়িৎসহাক রবিনের শাসনামলে। তাঁর মতে, বাধাটি সাংবিধানিক বা বাস্তব নয়, বরং আদর্শগত।

 নেতারা কী বলছেন?

নেতানিয়াহু মঙ্গলবার আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সাথে জোট গঠনকে ‘লজ্জাজনক ও কলঙ্কজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ইসরাইলকে বিপদের মুখে ফেলা এবং ইহুদিবাদবিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠন করা নিষিদ্ধ—একেবারেই নিষিদ্ধ।’

বর্তমানে তৃতীয় স্থানে থাকা বেনেটও অবস্থান বদলে জানিয়েছেন, তিনি সরকারে কেবল ‘ইহুদিবাদী’ দলগুলোকে চান; আরব দলগুলোকে রাখতে চান না। বিপরীতে, আইজেনকটের বিরোধী জোটের অংশ মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান আরব দলগুলোর সাথে সহযোগিতায় অস্বীকৃতি জানানোর নীতি পরিত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ইহুদি ভোট আর আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আমরা আর মেনে নিতে পারি না।’

ইসরাইলি গণতন্ত্রের জন্য এর অর্থ কী?

নাজ্জারের মতে, ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর আরব দলগুলোর সাথে কাজ করতে অনীহা ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক বর্ণবাদী চরিত্র প্রকাশ করে। তিনি বলেন, বিরোধী নেতারা নেতানিয়াহু ও কট্টর ডানপন্থীদের গণতন্ত্রের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। অথচ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সাথে ক্ষমতা ভাগ করার চেয়ে তাদের অনেকেই নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় থাকতেই দিতে বেশি আগ্রহী।

নাজ্জারের ভাষায়, আপত্তি শুধু কোনো নির্দিষ্ট আরব দল বা তাদের কর্মসূচি নিয়ে নয়; আপত্তি ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের প্রকৃত শাসনক্ষমতা পাওয়ার ধারণা নিয়েও। তিনি বলেন, ‘এক-পঞ্চমাংশের বেশি নাগরিককে ভোট দেয়ার অনুমতি দিয়ে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মৌলিকভাবেই অবৈধ মনে করা হলে কোনো রাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্যভাবে নিজেকে গণতান্ত্রিক বলতে পারে না।’

তাঁর মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটার হিসেবে গ্রহণ করা হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে ক্ষমতা চাইলে তাদের প্রত্যাখ্যান করা হয়। নাজ্জার বলেন, ‘এটি ইসরাইলি গণতন্ত্রের আকস্মিক ব্যর্থতা নয়; বরং ইহুদি রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গড়ে তোলা ব্যবস্থারই পরিণতি।’

তিনি আরো বলেন, নেতানিয়াহুকে সরাতে আইজেনকট সত্যিই আন্তরিক হলে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি এই বর্ণবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবেন, নাকি নেতানিয়াহুর বছরের পর বছর কাজে লাগানো সেই বর্জনমূলক রাজনীতির মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখবেন।