
ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বুধবার বিকেলে জানিয়েছে, ৮৯.৮ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেতে যাচ্ছে এবং 'য়াশার' পার্টির চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি আসন পাচ্ছে। ফলে কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহু ও তার সুদূর-ডানপন্থী মিত্রদের ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ফিলিস্তিনি আরব ভোটাররা রেকর্ড সংখ্যায় কেন্দ্রে উপস্থিত হন। এর ফলে মূলত আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি রাজনৈতিক দল যৌথভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে, যা তাদের পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে মূল সিদ্ধান্তকের ভূমিকায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এর আগে তাদের সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৫টি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা নাগাদ সামনে আসা এই চিত্রটি নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে মূলধারার জনমত জরিপগুলোর পূর্বাভাসের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। জরিপগুলোতে আইজেনকোটের জোটকে নেতানিয়াহুর থেকে কিছুটা এগিয়ে রাখা হয়েছিল, যদিও কারোর জন্যই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ পরিষ্কার ছিল না।
এমনকি মঙ্গলবার রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত বুথফেরত এক্সিট পোলেও আইজেনকোটের জোটকে নেতানিয়াহুর চেয়ে দুই-তিনটি আসনে এগিয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তবে রাত গড়িয়ে বুধবার বিকেলের দিকে গণনা যত বাড়তে থাকে, দেখা যায় যে এক্সিট পোলের হিসেব ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং নেতানিয়াহুর দল ও জোট উভয়ই আইজেনকোটকে পেছনে ফেলে সামনে চলে এসেছে।
বুধবার রাত ৯টার কিছু পরে এক হালনাগাদ তথ্যে নির্বাচন কমিশন জানায়, মোট ভোটের ৮৯.৮ শতাংশ গণনা শেষ হয়েছে, যা মূলত সব সাধারণ কেন্দ্রের ভোটের চিত্র। যদিও এই ফলাফল চূড়ান্ত নয়, তবে এতে নাটকীয় কোনো বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, বাকি থাকা সাধারণ ব্যালটগুলো গণনায় বাড়তি সতর্কতা ও নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে, যার কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার বিশেষ ব্যালট (সো-কলড 'ডাবল এনভেলপ' ভোট) গণনা বাকি রয়েছে। বৃহস্পতিবার শেষরাত ১টা থেকে এই গণনার কাজ শুরু হবে এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রমতে, এই ডাবল এনভেলপের প্রাথমিক হিসাবটি চূড়ান্ত নয়, কারণ কর্মকর্তারা এখনো কেন্দ্র থেকে আসা ব্যালট জমা নিয়ে প্রসেসিং করছেন।
এই ভোটগুলো প্রধানত সেনা সদস্য, কারাবন্দী, বিদেশে নিযুক্ত কূটনীতিক এবং নিজ কেন্দ্রে ভোট দিতে না পারা বিশেষ ব্যক্তিদের। তারা অন্য কোথাও ভোট দিয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার পরেই এই ভোট গণনা করা হয়।
ফলে পুরো ভোট গণনার চূড়ান্ত বিবরণী বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রকাশিত হবে। তবে নির্বাচনের অফিসিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হবে ৪ নভেম্বর।
নেসেটের প্রতিটি আসনের জন্য আনুমানিক ৪০,০০০ ভোটের প্রয়োজন হয়। ফলে সেনা ও বিশেষ ব্যবস্থার এই বিপুল অনুপস্থিত ভোট রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এগুলো চূড়ান্ত হিসাবের সাথে যোগ করা হবে।
ইতিমধ্যে, পুরো দেশজুড়ে এক রাজনৈতিক বিভক্তির স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট—কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয় পায়নি; যদি না তারা একে অপরের সাথে অথবা আরব দল 'রাম' ও 'জয়েন্ট লিস্ট'-এর সাথে সমঝোতায় যেতে রাজি হয়।
বিকেল ২:৩২ মিনিটের আপডেট অনুযায়ী, ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুর 'লিকুদ' সর্বোচ্চ ২৬টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে রয়েছে, যার পরেই ২১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে আইজেনকোটের 'য়াশার'।
নাফতালি বেনেটের 'বিয়াহাদ' এবং ইউসেফ জাবারিনের 'জয়েন্ট লিস্ট' দল দুটি ১২টি করে আসন পেয়েছে এবং বামপন্থী 'ডেমোক্র্যাটস' ৮টি আসন ধরে রেখেছে।
উগ্র ডানপন্থী 'ওৎজমা ইহুদিত', অতি-অর্থোডক্স 'শাস' এবং 'ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম'—প্রতিটি দল ৭টি করে আসন পেয়েছে। মানসুর আব্বাসের 'রাম' এবং অ্যাভিগডোর লিবারম্যানের 'ইসরাইল বেইতেনু'-ও ৭টি করে আসন নিশ্চিত করেছে।
বাকি থাকা আসনগুলোর মধ্যে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের 'রিলিজিয়াস জায়নিজম' পেয়েছে ৬টি আসন।
অন্যদিকে, ইয়োয়াজ হেনডেলের 'রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি' ২.৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩.২৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় থ্রেশহোল্ড পূরণ করতে পারেনি। একইসাথে ওফের উইন্টারের 'পিপলস অব ইসরাইল' মাত্র ১.৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে থ্রেশহোল্ডের নিচে রয়ে গেছে।
অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের বিকল্প প্ল্যাটফর্ম হিসেবে লড়াই করা ছোট দল 'হ্যারোদি পাবলিক' মাত্র ০.১৯ শতাংশ ভোট পেয়ে অনেক পেছনে পড়ে গেছে।
বাস্তবিকভাবে, আসন বন্টনের এই চিত্র অনুযায়ী লিকুদ, শাস, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, ওৎজমা ইহুদিত এবং রিলিজিয়াস জায়নিজম নিয়ে গঠিত নেতানিয়াহু জোট পাচ্ছে মোট ৫৩টি আসন—যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১) থেকে ৮টি আসন কম। বর্তমান নেসেটে তাদের ৬৮টি আসন ছিল, যা থেকে এটি বড় ধরনের পতন।
অন্যদিকে য়াশার, বিয়াহাদ, ডেমোক্র্যাটস এবং ইসরাইল বেইতেনু নিয়ে গঠিত আইজেনকোটের বিরোধী জোট পাচ্ছে ৪৮টি আসন—যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা থেকে ১৩টি কম।
আর ফিলিস্তিনি আরব দল দুটি—জয়েন্ট লিস্ট এবং রাম—যৌথভাবে পেয়েছে বাকি ১৯টি আসন, যা তাদের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ এবং আগের মেয়াদের ১০টি আসনের প্রায় দ্বিগুণ। বামপন্থী 'ডেমোক্র্যাটস' ছাড়া বাকি সব জায়নবাদী দল যদি আরব দলগুলোর সাথে সহযোগিতা নাকচ না করত, তবে আরব দলগুলোর এই বিশাল জয় নেতানিয়াহু-বিরোধী জোটকে অনায়াসেই ক্ষমতার দৌড়ে সামনে এনে দাঁড় করাতে পারত।
সূত্র : টাইমস অব ইসরাইল
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








