ইসরাইল
কারা এই ইসরাইলি আরব। সংগৃহীত

ইসরাইলের সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ফিলিস্তিনি আরবদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ এবং নেসেটে তাদের বিপুল সাফল্য বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে। ইসরাইলি রাজনীতিতে যারা সাধারণত প্রান্তিক বা উপেক্ষিত বলে বিবেচিত হতো, সেই আরব ভোটাররাই এবার বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোটের সরকার গঠনের পথ রুদ্ধ করে দেয়ার প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছেন।

Advertisement

কিন্তু প্রশ্ন জাগে—ইসরাইলের ভূখণ্ডে বাস করা এই ফিলিস্তিনি আরবরা আসলে কারা? ইতিহাসে এদের উৎপত্তি কোথায়, তাদের সংখ্যা কত, এবং এক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকে তারা কি সাধারণ ইসরাইলিদের মতো সমান নাগরিক অধিকার পান?

এই ফিলিস্তিনি আরবরা কারা? 

১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সংঘটিত যুদ্ধে (যাকে ফিলিস্তিনিরা 'নাকবা' বা চরম বিপর্যয় বলে আখ্যায়িত করে) প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বা বহিষ্কৃত হতে বাধ্য হন। তবে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি আরব তখন নিজস্ব বাড়িঘরেই থেকে যান।  ইসরাইল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর যেসকল ফিলিস্তিনি আরব এই ভূখণ্ডের সীমানার ভেতরে রয়ে যান, তাদেরকেই মূলত ‘ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক’ বা সাধারণ ভাষায় ‘ইসরাইলি আরব’ বলা হয়। এরা পশ্চিম তীর বা গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের থেকে প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে আলাদা, কারণ এরা ইসরাইলি পাসপোর্ট ধারণ করেন এবং দেশটির মূলধারার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন।   

ধর্মীয় পরিচয়ের দিক থেকে এদের প্রায় ৮৩ শতাংশ মুসলিম, ৯ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ৮ শতাংশ দ্রুজ সম্প্রদায়ভুক্ত।

সংখ্যা ও জনসংখ্যার বিন্যাস

বর্তমানে ইসরাইলে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরবের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ (২ মিলিয়ন)।এরা ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২১ শতাংশ।অর্থাৎ, ইসরাইলের প্রতি ৫ জন নাগরিকের মধ্যে ১ জনই ফিলিস্তিনি আরব।এদের একটি বড় অংশ দেশটির উত্তরাঞ্চল (গ্যালিলি অঞ্চল), মধ্যাঞ্চল (যাকে 'ট্রায়াঙ্গেল' বলা হয়) এবং দক্ষিণাঞ্চলের নেগেভ (নাকাব) মরুভূমির বিভিন্ন আরব শহর ও গ্রামে বসবাস করেন। কিছু অংশ হাইফা, জাফা ও একরের মতো মিশ্র (ইহুদি-আরব) শহরেও থাকেন।(উল্লেখ্য : অধিকৃত পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুসালেমে বসবাসকারী প্রায় ৫৫ লাখ ফিলিস্তিনি ইসরাইলের সামরিক শাসনের অধীনে জীবনযাপন করেন এবং ইসরাইলি নির্বাচনে তাদের ভোট দেয়ার কোনো অধিকার নেই।)

তারা কি নাগরিক হিসেবে সমান সুযোগ-সুবিধা পান? 

আইনগত ও তাত্ত্বিকভাবে এরা ইসরাইলের ভোটাধিকারপ্রাপ্ত পাসপোর্টধারী নাগরিক হলেও, বাস্তবে এরা গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার।   

ক) রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার : তারা পাসপোর্ট ধারণ করায় ভোটে অংশ নিতে পারেন এবং নেসেটে প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন। তবে দীর্ঘ ধরে প্রধান সারির জায়নবাদী রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠনের সময় আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে এসেছে বা প্রান্তিক করে রেখেছে।
   
খ) আইনগত বৈষম্য ('নেশন-স্টেট' আইন) : ২০১৮ সালে ইসরাইলি পার্লামেন্টে পাস হওয়া 'জাতি-রাষ্ট্র আইন' অনুযায়ী ঘোষণা করা হয় যে—ইসরাইল কেবল ইহুদি জনগণের জন্য একটি রাষ্ট্র। এই আইনের মাধ্যমে আরবি ভাষার রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা বাতিল করা হয় এবং জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেবল ইহুদিদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনি আরবরা রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হন।   

গ) জমি ও গৃহায়ন বৈষম্য : ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের জন্য নতুন আবাসন বা শহর গড়ে তোলার ওপর কঠোর সরকারি কড়াকড়ি রয়েছে। অনুমতির অভাবে তৈরি বহু আরব ঘরবাড়ি নিয়মিত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া জমি বাজেয়াপ্তকরণ ও অবকাঠামোগত বরাদ্দের ক্ষেত্রে ইহুদি এলাকাগুলোর তুলনায় আরব শহরগুলো ব্যাপকভাবে পিছিয়ে।  

ঘ) অর্থনৈতিক ও বাজেটে বৈষম্য : শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় অবকাঠামো খাতের সরকারি বাজেটে আরব এলাকাগুলো ক্রমাগত বৈষম্যের শিকার হয়। ইসরাইলের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনসংখ্যার বড় একটি অংশই এই আরব সম্প্রদায়।   

ঙ) সামরিক বাহিনী থেকে ছাড় ও সামাজিক মূল্য : ইসরাইলি ইহুদিদের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও ফিলিস্তিনি আরবদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা সেনাবাহিনীতে না যাওয়ার কারণে পরে সাবেক সেনা সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত শিক্ষা, গৃহায়ন বা সরকারি চাকরির অনেক বিশেষ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।   

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তাদের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গাজায় ২০২৩ সালের পর থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং ইসরাইলি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মুখে ফিলিস্তিনি নাগরিকরা এবার তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে ভোটকেন্দ্রগুলোতে উপস্থিত হয়েছেন।ভোটারের উপস্থিতির হার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে 'জয়েন্ট লিস্ট' এবং 'রাম' দল দুটি মিলিয়ে নেসেটে ১৮টি সম্ভাব্য আসন পেতে যাচ্ছে। এর ফলে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট বা আইজেনকোটের মধ্যপন্থী বিরোধী জোট—কারোর পক্ষেই আরব দলগুলোর সমর্থন বা সম্মতি ছাড়া সরকার গঠন করা গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ইসরাইলের ফিলিস্তিনি আরবরা এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনের ভেতর দিয়ে যান—তারা একদিকে ইসরাইলি নাগরিক, অন্যদিকে রক্তের ও ইতিহাসের সূত্রে ফিলিস্তিনি জাতির অংশ। এক শতকের চরম টানাপোড়েন ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের মধ্যেও তারা নিজেদের ভিটেমাটি আঁকড়ে রেখে আজ ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘পাওয়ার ব্রোকার’ বা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সূত্র : বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া