ইসরাইল
ফিলিস্তিনিদের হাতে নেতানিয়াহুর ভাগ্য!। সংগৃহীত

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনে ফিলিস্তিনি দলগুলোর বিশাল জয় দেশটির মূলধারার বিরোধী জোটের সামনে এক জরুরি ও মৌলিক চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে : হয় ইসরাইলি আরবদের সাথে সহযোগিতা করা, না হয় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার পথ সুগম করে দেয়া।

Advertisement

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত এক্সিট পোলের পর বিরোধী জোটের প্রধান গাদি আইজেনকোট এটিকে 'ইসরাইলের জায়নবাদী জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার' বিজয় হিসেবে ঘোষণা করলেও, নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফল তার চেয়ে বহুগুণ জটিল হতে যাচ্ছে।

নতুন ও পুরনো নেসেটের (ইসরাইলি পার্লামেন্ট) মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনি দলগুলোর নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়া প্রতিনিধিত্ব। তাদের আসন সংখ্যা আগের ১০টি থেকে বেড়ে ১৭ বা ১৮টি হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এটি ইসরাইলের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন লড়াইয়ের সীমানা তৈরি করেছে। এখন ইসরাইলি আরবদের চাইলেই আর সহজে একপাশে ঠেলে রাখা কিংবা উপেক্ষা করা সম্ভব হবে না।

এক্সিট পোলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট ও তার সমর্থকদের তুলনায় আইজেনকোটের বিরোধী ব্লককে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রাখা হয়েছে; যদিও প্রধানমন্ত্রীর দল লিকুদ এখনো একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

চূড়ান্ত ফলাফলে যদি এর প্রতিফলন ঘটে, তবে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ কাকে প্রথমে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা পাবেন। যদি একজন প্রার্থী ছয় সপ্তাহের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হন, তবে সেই সুযোগ যাবে দ্বিতীয় বিকল্পের কাছে। এটি অত্যন্ত দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া হতে পারে, এবং এই পুরোটা সময় নেতানিয়াহুর জোটই অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে থেকে যাবে।

আইজেনকোট হয়তো যুক্তি দেবেন যে তার নেতৃত্বাধীন জোটটি সার্বিকভাবে বড় এবং নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে দরকষাকষির সুযোগ তারই বেশি। তবে তা করতে হলে তাকে এবং তার 'পরিবর্তন' জোটের সহযোগীদের ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো—'জয়েন্ট লিস্ট' এবং 'রাম' (ইউনাইটেড আরব লিস্ট)-এর সাথে আলোচনায় বসতে হবে।

তারা সম্ভবত 'রাম' এবং এর নেতা মনসুর আব্বাসের সাথে কথা বলা সহজ মনে করবেন। আব্বাস ইতিমধ্যেই নাফতালি বেনেটের ডানপন্থী সরকারে অংশ নিয়েছিলেন, যিনি এখন আইজেনকোট জোটের শরিক। আব্বাস রাজনৈতিক আপস করতে ইচ্ছুক এবং মঙ্গলবার তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এই নির্বাচনে তার অগ্রাধিকার হলো 'বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, [বেজালেল] স্মোটরিচ এবং [ইতামার] বেন-গভিরকে ক্ষমতাচ্যুত করা'।

তবে এক্সিট পোলের ভিত্তিতে করা বেশিরভাগ হিসাব বলছে ফিলিস্তিনি দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে 'রাম' ছোট দল, নতুন নেসেটে যাদের সম্ভাব্য আসন সাতটি। আইজেনকোট ব্লকের অন্যান্য শরিকের সম্মতিতে কোনো চুক্তি হলেও একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য এই আসন যথেষ্ট হবে কি না তা স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, ১০ বা তার বেশি সম্ভাব্য আসন পাওয়া 'জয়েন্ট লিস্ট'-এর সাথে আলোচনা অনেক বেশি কঠিন হবে। আইজেনকোট তাদের সামনে চারটি শর্ত রেখেছেন : ইসরাইলকে একটি ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ইসরাইলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ব্যক্ত মূল্যবোধ স্বীকার করা, ইসরাইলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগের নীতি মেনে নেওয়া (যারা এতদিন অব্যাহতি পেয়ে আসছিলেন), এবং হামাসকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিন্দা জানানো।

মঙ্গলবার ভোট গণনাকালে 'জয়েন্ট লিস্ট'-এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হ্যাদাশ -এর সাধারণ সম্পাদক আমজাদ শাবিতা বলেন, জোট আলোচনার জন্য শর্ত চাপিয়ে দেয়ার মতো অবস্থানে আইজেনকোট নেই।

শাবিতা বলেন, 'জয়েন্ট লিস্টের সাথে শর্ত চাপিয়ে কাজ হবে না। আমরা সমমর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা করব, কারণ আমাদের একে অপরকে দরকার।'

ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর একটি বা উভয়ের সাথেই সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে, আইজেনকোট অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি সংখ্যালঘু সরকার চালানের চেষ্টা করতে পারেন, যা প্রতিটি প্রস্তাব পাসের সময় পৃথক সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকবে।

তবে এটি হবে একটি অত্যন্ত অস্থির সমাধান, যা আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। আর সেটি হলে নেতানিয়াহু রক্ষণশীল ইসরাইলি ইহুদিদের সমর্থন পুনরুদ্ধার করার সুযোগ পাবেন এবং তার নির্বাচনী স্লোগান 'ডানপন্থী জোট নাকি ফিলিস্তিন' (যা হিব্রুতে ছন্দের মতো শোনায়)—সেটিকে সঠিক প্রমাণ করার দাবি তুলতে পারবেন।

বিগত তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে নেতানিয়াহুকে পরাজিত বলে মনে হলেও, প্রতিবারই তিনি চুক্তি করার অসাধারণ দক্ষতার জোরে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এবারও তিনি সেইরকম কোনো চমত্কার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটাবেন না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এবার যদি তিনি ফিরে আসেন, তবে তার রাজনৈতিক জীবন ফিরে পাওয়ার পেছনে অবদান থাকবে তারই ঘোষিত রাজনৈতিক শত্রুদের—যারা ইসরাইলের গভীর বর্ণগত বিভাজন ঘুচিয়ে ঐতিহাসিক সমঝোতায় যাওয়ার বদলে তাকে রাজনৈতিক লাইফলাইন বা বাঁচার সুযোগ করে দেবেন।

সূত্র : গার্ডিয়ান