ইসরাইল
বিপুল জয়ে ইসরাইলের নির্বাচন পাল্টে দিয়েছে ফিলিস্তিনিরা। সংগৃহীত

ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অভূতপূর্ব উপস্থিতি ও বিপুল ভোটের মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা জায়নবাদী বিরোধী দলগুলোর কোনো পক্ষই সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় আসন পাচ্ছে না বলে মঙ্গলবার প্রকাশিত এক্সিট পোলে দেখা গেছে।

Advertisement

স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম 'কান' জানায়, এক্সিট পোলে নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে এবং বিরোধী জোট পেতে পারে ৫৩টি আসন—যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেক দূরে।

অন্যদিকে, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি জোট 'জয়েন্ট লিস্ট' এবং 'রাম' মিলে ১৮টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি হলে তা হবে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে আরব পার্লামেন্ট সদস্যদের আসন জয়ের এক ঐতিহাসিক রেকর্ড।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের আক্রমণের পর গাজায় গণহত্যা এবং অঞ্চলে ইসরাইলের শুরু করা বিভিন্ন যুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনে শুরু থেকেই ফিলিস্তিনিদের ভোট দেওয়ার হার বেশি থাকবে বলে স্পষ্ট সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল।

গত চার বছরে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে ইসরাইল রাষ্ট্র গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা তাদের জীবন বিষিয়ে তুলেছে এবং ইসরাইলের নেতৃত্ব ও সমাজ কীভাবে আরবদের প্রতি ক্রমেই বৈষম্যমূলক হয়ে উঠেছে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে তারা রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে 'মিডিল ইস্ট আই'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিলিস্তিনিরা জানিয়েছিলেন যে, তাদের আশঙ্কা ছিল এই নির্বাচনে তাদের নিজস্ব অস্তিত্বই ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।

যদিও তিনটি প্রধান টিভি চ্যানেলের এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপের প্রাক্কলনে কিছুটা পার্থক্য ছিল, তবে মঙ্গলবার রাতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা পুরো নির্বাচনের চিত্র পাল্টে দিয়েছেন এবং নেতানিয়াহু ও তার ইহুদি বর্ণবাদী মিত্রদের সরকার গঠনে বাধা সৃষ্টি করেছেন।

অন্যদিকে, বিরোধী জোটের নেতা আইজেনকোটের জোটও ফিলিস্তিনি দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া কার্যকর সরকার গঠন করতে অক্ষম বলে মনে হচ্ছে; যদিও নির্বাচনী প্রচারণাকালে তার জোটের অনেক শরিকই ফিলিস্তিনি দলগুলোর সাথে জোট করার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ, কিন্তু তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে প্রায় সবসময়ই সরকার গঠনের যেকোনো প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।

আপাতত জোট গঠনের আলোচনা ও দরকষাকষির প্রক্রিয়া শুরু হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকছেন।

তার দল 'লিকুদ' প্রায় ২৫টি আসন পেয়ে কেসেটের বৃহত্তম দল হতে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে; প্রথা অনুযায়ী এর অর্থ হলো প্রেসিডেন্ট তাকেই প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ দেবেন।

বিরোধী জোটের নেতৃত্বদানকারী সাবেক সেনাপ্রধান গ্যাবি আইজেনকোট বলেন, নির্বাচনের এই ফলাফল নেতানিয়াহুর প্রতি জনগণের 'আস্থাহীনতা' প্রকাশ করে।

আরেক বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ মন্তব্য করেন যে, নেতানিয়াহু এক 'মর্মান্তিক পরাজয়ের' মুখে পড়েছেন।

তবে সেনা সদস্য, হাসপাতাল ও অন্যান্য বিশেষ ভোটিং ব্যবস্থার প্রায় পাঁচ লাখ ভোট সপ্তাহের শেষের দিকে গণনা শেষ হলে চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া যাবে, যার জন্য আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেরন রাপোপোর্ট এই ফলাফলকে 'নেতানিয়াহু যুগের অবসান' বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি মিডিল ইস্ট আইকে বলেন, 'তিনি পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, এটি ১০০ ভাগ নিশ্চিত। তার লিকুদ পার্টি পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল হতে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে তার জোট যদি অনেক দূরে থাকে, তবে এর কোনো গুরুত্ব নেই।'

তিনি আরো যোগ করেন, 'আমরা কেমন সরকার পাব তা স্পষ্ট নয়। কোনো দলই সরকার গঠন করতে না পারলে হয়তো ফের নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হতে পারে।'

রাপোপোর্ট উল্লেখ করেন যে, বিরোধী ব্লকের মূল নেতা নাফতালি বেনেট এবং অ্যাভিগডোর লিবারম্যান ফিলিস্তিনিদের প্রতি চরম বৈরী ভাবাপন্ন এবং তারা তাদের সাথে জোটে বসার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।

'তবে আদর্শকে পাশে সরিয়ে রাখলে, রাজনীতিবিদরা যদি দেখেন যে যেখানে নেতানিয়াহুর হাতে মাত্র ৫০টি আসন রয়েছে, সেখানে ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থনে ৭০টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠনের সুযোগ আছে—তখন আবারো নির্বাচনে গিয়ে নেতানিয়াহুকে নতুন সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হবে তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী।'

ইসরাইলের 'ভান লিয়ার ইনস্টিটিউট'-এর গবেষক ও বিশ্লেষক আমির ফখুড়ি এই নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে একটি 'সত্যিকারের ঐতিহাসিক ঘটনা' বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি মিডিল ইস্ট আইকে বলেন, 'তারা একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মুখোমুখি দাঁড়াতে অভূতপূর্ব সংখ্যায় কেন্দ্রে গিয়েছিলেন—যে নেতৃত্বকে তারা নিজেদের জাতির বিরুদ্ধে ঘটিত মারাত্মক অপরাধের জন্য দায়ী বলে মনে করে: গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে জাতিগত নিধন এবং নিজ দেশে বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়ন ও ভয়ভীতি প্রদর্শন।'

ফখুড়ি আরো বলেন, নির্বাচনের এই ফলাফল কেবল ইসরাইলের দীর্ঘতম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সরানোর বিষয় নয়। 'এটি বর্ণবাদ টিকিয়ে রাখা এবং একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক সংস্কার শুরু করার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার লড়াই।'

তিনি বলেন, 'ইতিহাস ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একটি অসাধারণ অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের জনগণকে রক্ষা করতে একত্রিত হয়ে এখন তারা হয়তো সাধারণ ইহুদি ইসরাইলিদেরও তাদের দেশের এই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।'

'এখন মূল প্রশ্ন হলো—ইহুদি ইসরাইলি রাজনৈতিক নেতারা কি সেই সম্ভাবনাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, নাকি তারা ক্রমাগত সামরিকীকৃত ও চরম বর্ণবাদী স্পার্টার দিকেই ধাবিত হতে পছন্দ করবেন।'

সূত্র : মিডল ইস্ট আই