
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন।
১৯৯৬ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা এই নেতা সামরিক সাফল্যকে নির্বাচনী সমর্থনে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে জনরোষ, অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সম্ভাব্য জোটসঙ্গীর সঙ্কট তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেরুসালেম থেকে সিনহুয়ার এক বিশ্লেষণে বলা হয়, হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলের প্রথম নির্বাচন এটি। গাজা, লেবানন ও ইরানে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ দেশটির রাজনীতির চেহারা পাল্টে দিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভাজন আরো গভীর করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে নেতানিয়াহুর সামনে থাকা পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো :
৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের উত্তরাধিকার
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার পরিবর্তে ইসরাইলের সামরিক অর্জনের ভিত্তিতে ভোটারদের তার নেতৃত্বের মূল্যায়নে রাজি করানো। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে পণবন্দী করা হয়।
নেতানিয়াহু ওই হামলার জন্য ব্যক্তিগত দায় স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। একইসাথে তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগও নেননি। এর পরিবর্তে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক সাফল্যকে নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছেন।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইলানা শ্পাইজম্যান ইহুদি টেলিগ্রাফিক অ্যাজেন্সিকে (জেটিএ) বলেন, নেতানিয়াহুর প্রচারণায় ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে পরবর্তী সময়ে অর্জিত সামরিক সাফল্যের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
তবে হামলায় নিহত ও পণবন্দী ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এ বয়ান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। গত ২০ অক্টোবর গাজায় নিহত ১৭ জন পণবন্দীদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের প্রিয়জনদের মৃত্যুকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন।
তারা বলেন, ‘আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার জন্য জনসমর্থন চাইতে তাঁদের মৃত্যুকে ব্যবহার করবেন না।’
৫ অক্টোবর চ্যানেল ১২-এর এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে প্রধানত দায়ী করেন। তবে তার জোটের সমর্থকদের মধ্যেও ৭৫ শতাংশ তাকে অন্তত কিছুটা দায়ী বলে মনে করেন।
ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জনমত বিশেষজ্ঞ তামার হারম্যান বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলা আগে থেকেই বিদ্যমান রাজনৈতিক আনুগত্যকে আরো জোরদার করেছে।
তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ তথ্য ইতোমধ্যে সামনে এসেছে। ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যাই মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।’
আইজেনকটের চ্যালেঞ্জ
নেতানিয়াহুর সামনে এবার এক ব্যতিক্রমী প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট। সাবেক এই সেনাপ্রধান যুদ্ধকালীন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। গাজায় যুদ্ধে তার ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হন।
আইজেনকট প্রশ্ন তুলেছেন, নেতানিয়াহু সামরিক অভিযানকে কৌশলগত অর্জনে রূপ দিতে পেরেছেন কি না।
চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেন, ‘ইসরাইলের কোনো সরকার এতটা অবাধে পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ এবং জনগণ ও বিশ্বের কাছ থেকে এতটা বৈধতা কখনো পায়নি। অথচ এত বড় কৌশলগত ব্যর্থতার মুখেও পড়েনি।’
আইজেনকট ৭ অক্টোবরের হামলা নিয়ে স্বাধীন তদন্ত, আরো বিস্তৃত সামরিক নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে ফিলিস্তিননীতি নিয়ে দুই নেতার অবস্থানের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম। দুজনই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানান।
আইজেনকট ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও কিছু বসতি সম্প্রসারণের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু এমন দলগুলোর সাথে সরকার পরিচালনা করছেন, যারা অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত করার পক্ষে।
ফলে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শান্তি প্রতিষ্ঠার পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা ও যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিকে ঘিরেই বেশি আবর্তিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা
নেতানিয়াহুর সামনে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অর্থনৈতিক চাপ। নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বলে তুলে ধরা তার সামরিক নীতিগুলো ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে আরো বিচ্ছিন্ন করেছে এবং নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
শুক্রবার চ্যানেল টেনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগের কথা স্বীকার করেন নেতানিয়াহু।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি উদ্বিগ্ন।’ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে তিনি ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহারের কথাও বলেন।
তবে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির হিব্রু ভাষার ব্যবসাবিষয়ক সংবাদপত্র ক্যালকালিস্ট ও গ্লোবসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার ১০৯ জন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও সাবেক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা ইসরাইলের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
এ বিতর্ক নেতানিয়াহুর নিরাপত্তাবিষয়ক নীতির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। সামরিক সাফল্যের জন্য ইসরাইলকে এমন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বহন করা কঠিন।
অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও অতি-ধর্মানুরাগীদের সামরিক নিয়োগ
দুর্নীতির মামলায় বিচার, বিচার বিভাগের তদারকি দুর্বল করার প্রচেষ্টা এবং অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদি পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির বিষয়গুলো নিয়েও নেতানিয়াহু বিরোধিতার মুখে রয়েছেন।
ঘুষ, প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন।
টানা তিন বছরের যুদ্ধ এবং সংরক্ষিত সেনাদের বারবার দায়িত্ব পালনের কারণে সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিরোধ আরো তীব্র হয়েছে।
ইয়েনেট ও ইয়েদিওথ আহরোনোথের জন্য ডায়ালগ ইনস্টিটিউটের আগস্টের এক জরিপে দেখা যায়, ৫০৯ জন সংরক্ষিত সেনার প্রায় ৭০ শতাংশ বলেছেন, অতি-ধর্মানুরাগী ইহুদি পুরুষদের সামরিক নিয়োগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তাদের ভোট দেয়ার সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
জরিপে অংশ নেয়া সাবেক লিকুদ সমর্থকদের মাত্র ৩৪ শতাংশ বলেছেন, তারা দলটিকে আবার ভোট দেয়ার বিষয়ে নিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, অতি-ধর্মানুরাগী মিত্রদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে নেতানিয়াহু সংরক্ষিত সেনাদের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে, সামরিক নিয়োগের আওতা বাড়ালে তার জোটের ওই মিত্রদের সাথে সম্পর্ক বিপন্ন হতে পারে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লড়াই
৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর জোটের সমর্থন ব্যাপকভাবে কমে যায়। পরে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও তা আগের অবস্থায় ফেরেনি।
কান, চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩-এর সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে। বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন এবং আরব দলগুলো ১৪ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে।
নেতানিয়াহু অতি-ধর্মানুরাগী ও উগ্র ডানপন্থী মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মধ্যে বেজালেল স্মোটরিচ ও ইতামার বেন-গভির রয়েছেন। পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত করার পক্ষে তাদের অবস্থান পশ্চিমা মিত্রদের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলেছে।
নেতানিয়াহুর দুর্নীতির বিচার এবং ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য তার দায়ের বিষয়টি উল্লেখ করে ডানপন্থী দলসহ বিরোধী দলগুলো তার নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
রেডিও ১০৩এফএমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আইজেনকট বলেন, ‘ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তির আওতায়ও আমি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করব না।’
এতে নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের সম্ভাব্য বিকল্প আরো সীমিত হয়ে পড়েছে।
জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিদিওন রাহাত জেটিএকে বলেন, ২০২২ সালে ৬৪টি আসন পাওয়া নেতানিয়াহুর জোটের সমর্থন কমেছে। তবে বিরোধী দলগুলোও এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এখানেই পরিস্থিতির বৈপরিত্য। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে অনেক বিরোধী দলের ঐকমত্য থাকলেও নিজেদের মধ্যকার বিভাজনের কারণে তারা বিকল্প সরকার গঠনে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে ইসরাইল আবারো নির্বাচনী অচলাবস্থার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র : সিনহুয়া/বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








