
ইয়েমেনের হাউছিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে। এসব হামলার লক্ষ্য শুধু সৌদি আরবের সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা নয়। রিয়াদের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায় তারা। এতে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
দুবাই থেকে প্রকাশিত দ্য গালফ নিউজ সোমবার (২৬ অক্টোবর) জানায়, রোববার দক্ষিণ সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা চালায় হাউছিরা। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। খামিস মুশাইতে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আভা, তায়েফ, নামাস ও জাজান শহরে সতর্কতা জারি করা হয়। খামিস মুশাইত লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়।
রিয়াদে রোববার ভোরে তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হাউছিদের প্রাণঘাতী হামলার পর দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকা রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত পরিসরে চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হাউছিরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আবার চালু হলেও সেটি তাদের সামরিক নিশানা হিসেবেই থাকবে। এ মাসের শুরুর দিকে আগের এক হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন।
তবে এই সংঘাত শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমানবন্দর ঘিরে নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ, ইরানের প্রভাব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর নিয়ন্ত্রণ।
এখন কেন হামলা বাড়াচ্ছে হাউছিরা?
ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়াই হামলা বৃদ্ধির তাৎক্ষণিক কারণ। তবে সৌদি আরব যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি চাপের মুখে, তখন রিয়াদের ওপর চাপ বাড়িয়ে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগও দেখছে হাউছিরা।
২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর সীমান্ত পেরিয়ে বড় ধরনের হামলা অনেকটাই বন্ধ ছিল। কিন্তু ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধে সেই সমঝোতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গত সেপ্টেম্বরে হাউছিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে কৌশলগত অবস্থান দখল করে। এরপর সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালায়। হাউছিরা তাদের হামলাকে সৌদি সামরিক অভিযান ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিধিনিষেধের জবাব বলে দাবি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মাশুল বাড়ানোও হাউছিদের এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
হাউছিরা আসলে কী চায়?
ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশটির উত্তরাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায় হাউছিরা। একই সাথে ভবিষ্যৎ সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেতে চায় তারা।
নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর খুলে দেয়া, বাইরের সামরিক চাপ কমানো এবং ইয়েমেনের প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর প্রতি সৌদি সমর্থন সীমিত করাও তাদের লক্ষ্য। বাব আল-মান্দাব প্রণালীর কাছে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে সামরিক শক্তি ও দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চায় তারা।
সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা দেখানোর পাশাপাশি ইরানের সাথে কৌশলগত সম্পর্কও বজায় রাখতে চায় হাউছিরা। ইরানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পেলেও ইয়েমেন নিয়ে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।
ইরানের হয়ে লড়ছে, নাকি নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে?
দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে হাউছিদের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কতটা, তা নিয়ে নানা মুনীর নানা মত।
ইরান হাউছিদের অস্ত্রপ্রযুক্তি, সামরিক দক্ষতা ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে। এর ফলে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বেড়েছে হাউছিদের।
রয়টার্স এ মাসে জানিয়েছে, ইয়েমেন নিয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছ থেকে ছাড় আদায় এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ওয়াশিংটনকে রাজি করানোর উদ্দেশ্যেও এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
তবে হাউছিরা কেবল ইরানের তৈরি কোনো সংগঠন নয়। ১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে এই আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ২০১৪ সালে তারা সানা দখল করে। এরপর থেকে নিজেদের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করা, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে দুর্বল করা এবং রাজনৈতিক স্বীকৃতি আদায় তাদের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলেও সৌদি আরবের সাথে হাউছিদের সংঘাত যে শেষ হবে, তার কোনোই নিশ্চয়তা নেই।
বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা কেন?
সৌদি আরবের প্রচলিত সামরিক শক্তির সাথে সরাসরি পাল্লা দিতে চায় না হাউছিরা। বরং দেশটির অর্থনীতিতে আঘাত হানা এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বিমানবন্দর, তেলের পাইপলাইন, শোধনাগার ও জাহাজে তেল ওঠানো-নামানোর টার্মিনাল সৌদি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব স্থাপনায় হামলায় বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারেন। একই সাথে জ্বালানি রফতানিও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
১০ অক্টোবরের প্রাণঘাতী হামলার পর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। শনিবার হাউছিরা ইয়ানবু ও রাবিগের আশপাশের স্থাপনা এবং পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনসহ বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার দাবি করে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। তবে এসব হামলায় স্থাপনাগুলোর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হাউছিদের হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে স্থাপনাও বন্ধ রাখতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি কীভাবে বদলেছে?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর সংঘাত হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর দিয়ে রফতানির ওপর আরো বেশি নির্ভর করছে।
এ কারণে ইয়ানবুর আশপাশের স্থাপনা এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব পথে হামলার হুমকি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি ব্যাহত করতে পারে হাউছিরা। একই সাথে ওয়াশিংটনের সাথে দর-কষাকষিতে ইরানের অবস্থান শক্ত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
রয়টার্সের উদ্ধৃত আঞ্চলিক সূত্রগুলোর মতে, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানোও এই অভিযানের উদ্দেশ্য। তবে হাউছিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত তেহরান সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে, এমনটা ধরে নেয়া ঠিক হবে না বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।
বাব আল-মান্দাব প্রণালী এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বাব আল-মান্দাব প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় টার্মিনাল থেকে তেল রফতানির জন্যও প্রণালীটি গুরুত্বপূর্ণ।
এএফপির খবরে বলা হয়েছে, গত মাসে দ্রুত অভিযান চালিয়ে হাউছিরা ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল দখল করে নেয়। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পরে সৌদি সমর্থিত বাহিনী হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলে অভিযান চালায়।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুই প্রণালী দিয়েই জাহাজ চলাচল গুরুতরভাবে ব্যাহত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প রফতানি পথও একসাথে সংকুচিত হতে পারে। এতে ট্যাংকারের বিমা ব্যয়, পণ্য পরিবহনের খরচ ও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরব কি হামলা ঠেকাতে পারবে?
সৌদি আরবের আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। রিয়াদ, তায়েফ, ইয়ানবু ও খামিস মুশাইতের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘটনা এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তবে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
বিমানবন্দর, শহর, তেল স্থাপনা ও শিল্পাঞ্চলসহ বিশাল এলাকাজুড়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করতে হয় সৌদি আরবকে। নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত এবং প্রতিহত করার চ্যালেঞ্জও এক রকম নয়। ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও তার ধ্বংসাবশেষ পড়ে হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বেসামরিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হতে পারে।
উত্তেজনা কমবে কীভাবে?
সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। হাউছিরা আরো স্বীকৃতি, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ চায়।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সীমান্ত পেরিয়ে নতুন হামলা ঠেকানোর মতো সমঝোতা চায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত সমঝোতার পথ আরো কঠিন করে তুলেছে। উত্তেজনা বাড়তে থাকলে সৌদি আরব পাল্টা হামলা জোরদার করতে পারে। বিশেষ করে নতুন কোনো হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলে বা জ্বালানি অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ছড়িয়ে পড়লে অন্য দেশও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
হাউছিরা সামরিক চাপ দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়। তবে এই কৌশলে তারা নিজেদের দাবি আদায় করতে পারবে, নাকি এর ফলে গোটা অঞ্চলেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে, তা এখনো অনিশ্চিত।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








