সৌদি আরব, হামলা, হাউছি
সৌদি আরবের দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি হামলায় দুইজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। সংগৃহীত

সৌদি আরবের দাম্মাম বিমান বন্দর এবং আরামকো তেল শোধনাগারে পৃথক হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া এসব হামলায় আরো ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

Advertisement

দেশটির জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় পূর্বঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি হামলায় দুইজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে একজন সৌদি নাগরিক ও একজন ভারতীয় বাসিন্দা; অন্যদিকে আহতদের মধ্যে সৌদি, ভারতীয়, ইয়েমেনি, বাংলাদেশী ও নেপালি নাগরিকরা রয়েছেন।

সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলায় কেউ কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন।

তবে দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলায় ব্যবহৃত ড্রোন বা এর উৎস সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

প্রসঙ্গত, এর আগে ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০৮ জন আহত হন—যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে ঘটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। নিহত সেই ১৩ জনের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশী নাগরিক।

সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের শুরু থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হাউছি হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন।

এদিকে, বুধবার আরেকটি হামলার ব্যাপারে অপর এক বিবৃতিতে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চলের আরামকো তেল শোধনাগারের শেবা তেলক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে আসা একটি ড্রোন প্রতিহত করার সময় এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

নিহতরা ফিলিপাইন ও নেপালের নাগরিক ছিলেন এবং আহতদের মধ্যে পাকিস্তানি ও ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং সরকারি সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকালে দেশটির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আরামকোর শেবা তেলক্ষেত্রে হামলার চেষ্টার সময় একটি ড্রোনকে মাঝপথে ধ্বংস করে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

তবে ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ আরামকোর স্থাপনার ওপর এসে পড়লে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, ড্রোনের আঘাতে তেলক্ষেত্রের বাইরে কর্মরত একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের একটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়।

এই ঘটনাটি আরামকো মূল সীমানার বাইরে ঘটেছে।

তবে এর ফলে তেল উৎপাদন বা অন্যান্য কার্যক্রমের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা ব্যাঘাত ঘটেনি।

একইসাথে, গত কয়েক ঘণ্টায় মদিনা ও পূর্বাঞ্চলের দিকে নিক্ষেপ করা পাঁচটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

তবে দেশটির হামলার এই দাবি অস্বীকার করেছে হাউছিরা।

ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বুধবার তাদের দল সৌদি আরবের মদিনা শহরের দিকে কোনো ড্রোন পাঠায়নি এবং দেশটির বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপও নেয়নি।

হাউছি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দেশটিকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া পাঁচটি ড্রোন ধ্বংস করার ঘোষণা দিয়েছিল।

সৌদি সামরিক জোটের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলাগুলোর সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে মদিনা এলাকাটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এ এক বার্তায় জানান, ‘সৌদি আরবের দিকে নিক্ষেপ করা চারটি ড্রোন মাঝপথেই প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে।’

পরবর্তীতে আরেকটি বার্তায় তিনি জানান, এই ড্রোনগুলোকে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল এবং মদিনা এলাকায় প্রতিহত করা হয়েছে।

সৌদি সামরিক জোটের মুখপাত্র আল-মালিকি এই হামলার জন্য সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে দায়ী করেননি।

তবে পরবর্তীকালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে আরো একটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানান।

হাউছিদের সামরিক মুখপাত্র বুধবার বলেছেন, দক্ষিণ ইয়েমেনের আল-মুকাল্লা শহরের একটি বিমানবন্দরে রাখা সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, সরকারপন্থী বাহিনীর ব্যবহারের জন্য সৌদি আরব ওই সামরিক সরঞ্জাম সেখানে নিয়ে গিয়েছিল।

এদিকে, হাউছি-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণে অন্তত ছয়জন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।

হাউছি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, তিন মাস আগে ইয়েমেনের বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে ওঠার পর থেকে ১৫৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একই সময়ে এই সঙ্ঘাতে অন্তত ১,৫৭৪ জন নিহত হয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘের হিসাবে, দুই লাখ ৫৬ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুতও হয়েছেন।

২০১৪ সালে হাউছিরা রাজধানী সানা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে উৎখাত করলে এই যুদ্ধ শুরু হয়। পরের বছর সরকারের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব রাষ্ট্রগুলোর জোট হস্তক্ষেপ করলে সংঘাত আরো তীব্র হয়ে ওঠে।

চার বছর ধরে চলা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি জুলাইয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে। সে সময় হাউছিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে একটি ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করে এবং সৌদি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।

হাউছিরা বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে সৌদি আরবের কথিত অবরোধ এবং সানা বিমানবন্দরে একটি বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এসব হামলা চালিয়েছে। ওই বিমান হামলার জন্য তারা সৌদি আরবকে দায়ী করেছে।

সেপ্টেম্বরে হাউছিরা বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলের একটি অংশ দখল করার পর সঙ্ঘাত আরো তীব্র হয়। বৈশ্বিক নৌপরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ এই জলপথের দিকে তাদের অগ্রযাত্রা তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ছয় মাস ধরে যুদ্ধ চলেছিল।

চলতি মাসের শুরুর দিকে সরকারপন্থী বাহিনী বলেছে, সৌদি বিমান সহায়তায় পাল্টা অভিযান শুরু করার পর তারা বাব আল-মান্দাবের ওপর নজর রাখা যায় এমন এলাকার নিয়ন্ত্রণ আবার ফিরে পেয়েছে।

তবে সেখানে এখনো তীব্র লড়াই চলছে। একইসাথে অবরুদ্ধ, সরকার-নিয়ন্ত্রিত তায়েজ শহরের আশপাশে এবং উত্তরে মারিব, আল-জাওফ, ধালে ও শাবওয়া প্রদেশেও লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

হাউছিদের হামলার মুখেই সৌদি আরবে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফর
এদিকে, ইরান সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার মুখে সৌদি আরবের প্রতি সমবেদনা ও সংহতি জানাতে এক আকস্মিক সফরে দেশটির রাজধানী রিয়াদে পৌঁছেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ।

এই সফরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন তিনি।

হাউছিদের হামলা বেড়ে যাওয়ার পর ম্যাক্রোঁই প্রথম কোনো পশ্চিমা নেতা যিনি সৌদি আরব সফর করলেন।

ম্যাক্রঁর পৌঁছানোর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো হুথি হামলার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানো এবং হাইড্রোকার্বন(জ্বালানি) সংস্থান নিরাপদ রাখা ও এর উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ বলেন, তিনি শুধু তার দায়িত্ব পালন করছেন।

সৌদি আরবে যাওয়ার আগে তিনি কাতারে ছিলেন।

সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, সৌদির প্রধান তেল টার্মিনাল বন্দর ইয়ানবুতে ফরাসি সামরিক সদস্য এবং সরঞ্জামাদি পাঠানো হয়েছে।

এমন এক সময়ে এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া হলো, যখন ইয়েমেনের দক্ষিণ হাথরামাউত প্রদেশের রাজধানী মুকাল্লার আল-রাইয়ান বিমানবন্দরে সামরিক কার্গো বিমানের মাধ্যমে পাঠানো সৌদি সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে হাউছি গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ।

একইসাথে, সামরিক উদ্দেশ্যে কোনো বেসামরিক স্থাপনা যাতে ব্যবহার না করা হয়, রিয়াদকে সতর্ক করেছে হাউছিদের একটি গোষ্ঠী।

সূত্র : বিবিসি