
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার বিস্তারিত নীল নকশা তৈরি করেছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ হামলা চালানোর কথা ভাবা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, টানা ৭২ ঘণ্টা হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত হানা হতে পারে। কিন্তু প্রায় আট মাসের সংঘাতেও যে লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি, মাত্র তিন দিনের বোমাবর্ষণে তা সম্ভব হবে কি না, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক গালফ নিউজ বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জানায়, মার্কিন কর্মকর্তা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। হামলার প্রস্তুতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সামরিক মহড়া জোরদার করেছে। নভেম্বরের শুরু নাগাদ বড় ধরনের সামরিক শক্তি প্রস্তুত রাখার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো নতুন হামলার অনুমোদন দেননি। বরং একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছেন।
৭২ ঘণ্টার হামলায় কী অর্জন করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের একাংশের ধারণা, টানা তিন দিনের তীব্র বোমাবর্ষণে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব। এতে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা যেতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র, ড্রোন স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো।
সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন ও ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ইরাকের আকাশে মহড়া চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা একটি প্রস্তাবিত সামরিক কৌশল মাত্র। তিন দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
আট মাসেও যা হয়নি, তিন দিনে কি তা সম্ভব?
ওয়াশিংটনের সামনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কয়েক মাসের সামরিক অভিযান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের পরও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবিগুলো মেনে নেয়নি ইরান।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, নতুন করে তীব্র হামলা চালালে ইরানের দুর্বল অর্থনীতি ধসের মুখে পড়তে পারে। এতে তেহরান আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারে। তবে এ ধারণা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।
পেন্টাগনের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল বলেন, ‘ক্রমেই অস্থিতিশীল ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলে আরো যুদ্ধ চালালে এই কৌশলগত সংকট কীভাবে কাটবে, তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কেউই দিতে পারেননি।’
তাঁর মতে, আগের সামরিক চাপও ইরানকে অর্থবহ আলোচনায় ফেরাতে পারেনি। ইরানি কর্মকর্তারাও মনে করেন, নতুন সংঘাতকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে—এ ধারণা অবাস্তব।
৩ নভেম্বরের নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, মার্কিন ভোটাররা ভোট দেয়ার আগে ইরানে নতুন হামলা চালানো হবে না। তবে এর পেছনে শুধু রাজনৈতিক হিসাবই কাজ করছে না।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, নভেম্বরের শুরু নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি, হাজার হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী সদস্য প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানে রাতের অন্ধকার দীর্ঘ হওয়াও মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর অভিযানে সুবিধা দিতে পারে।
নির্বাচনের পর সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা খোলা রেখেছেন ট্রাম্প। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে হামলা কেন?
চলতি বছর ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলার একাধিক প্রস্তাব নাকচ করেছেন বা পিছিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী হামলার প্রায় চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প অভিযান না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, তখন যুদ্ধবিমানগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল।
এদিকে, বুধবার যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরব থেকে জরুরি নয়—এমন দায়িত্বে থাকা দূতাবাসকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। হাউছিদের প্রাণঘাতী হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য মার্কিন মিশন থেকেও কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর স্পষ্ট করেছে, নিশ্চিতভাবে চলে যাওয়ার নির্দেশটি শুধু সৌদি আরবের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
বারবার সিদ্ধান্ত বদলানোর ফলে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এক মার্কিন কমান্ডারের ভাষায়, প্রতিদিনই পরিকল্পনা ওলটপালট হচ্ছে। আগের সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবহারের পাশাপাশি জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবে থাকতেও পারে, নাও পারে, সেগুলো নিয়ে প্রশাসন মন্তব্য করে না। তবে ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে জন্য ট্রাম্প সব বিকল্প খোলা রেখেছেন।
ইসরাইলের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলতে পারে?
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের পার্লামেন্ট নির্বাচনও হামলার পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। নেতানিয়াহু ইরানে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে। কিন্তু নির্বাচনে হেরে গেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পক্ষে বড় অভিযান চালানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
ইসরাইলি রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাজাল মুলায়েম বলেন, নেতানিয়াহু জরুরি ভিত্তিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন। তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখবেন। তিনি বলেন, ‘ইরান হামলা চালালে পরিস্থিতি এক রকম। কিন্তু নিজে থেকে আক্রমণ শুরু করা তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।’
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছিল, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের আগে ১০ অক্টোবর বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল ইসরাইল। তবে পরে জেরুজালেম পোস্ট ইসরাইলি সামরিক সূত্রের বরাতে এ দাবি নাকচ করে জানায়, আসন্ন হামলার কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি।
ইরানের জবাব কেমন হতে পারে?
ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে হামলা চালালে তার জবাব হবে আরো ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী।
ইরানের আলোচক বাকের গালিবাফের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি ৭২ ঘণ্টায় অভিযান শেষ করার ধারণাকে ‘কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘আমাদের হামলা হবে আরো তীব্র, সৃজনশীল ও ভিন্ন ধরনের।’
ইরানি কর্মকর্তারা বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর বাইরেও হামলার লক্ষ্যবস্তু বাড়ানোর কথা ভাবছেন। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে তথ্য সংরক্ষণকেন্দ্র এবং সাগরের তলদেশে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া ইন্টারনেট কেবল।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেইমান সালেহির মতে, ইরানের গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে ইরান সৌদি আরবের বড় তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ আমাদের বুঝিয়েছে, ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তেল ও জ্বালানির দাম বাড়ানো। কারণ এতে মার্কিন জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
কূটনীতি কি এখনো যুদ্ধ ঠেকাতে পারে?
সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালী নিয়ে ছাড় চাইছে। অন্যদিকে, তেহরান সংঘাতের অবসান, অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে চায়।
৮ অক্টোবর ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথে আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে।’ তবে পারমাণবিক ইস্যু এবং কোন পক্ষ আগে ছাড় দেবে, তা নিয়ে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
আপাতত ৭২ ঘণ্টাব্যাপী হামলা অনুমোদিত অভিযান নয়, সামরিক পরিকল্পনার একটি বিকল্প মাত্র। শেষ পর্যন্ত হামলা হবে কি না, তা নির্ভর করছে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর। তার আগে কূটনীতি কোনো সমাধান এনে দিতে পারে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








