ইরাক, মার্কিন বাহিনী
মঙ্গলবার ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ‘ক্যাম্প ভিক্টরি’তে দাঁড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক পরিবহন বিমান। রয়টার্স ফাইল ছবি

দুই দশক পর ইরাকে নিজেদের সর্বশেষ ঘাঁটিগুলো থেকে সরে যাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। বুধবারের মধ্যে তাদের এ প্রস্থান সম্পন্ন হতে পারে। এদিকে, মার্কিন বাহিনীর এই প্রস্থানকে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে ইরান ও তার মিত্ররা। কারণ দেশটিতে এখন তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। 

Advertisement

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছে।  

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় নেয়া সিদ্ধান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বাস্তবায়ন করছে (যদিও তারা ইরানের বিরুদ্ধেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে)।

ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র দলগুলোর যৌথ জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাকের’ কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাহারকে ‘ইরাকি ইসলামী প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও মর্যাদাবান ইরাকিদের জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয় এবং আমেরিকান পরিকল্পনার জন্য এক শোচনীয় পরাজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘৩০ সেপ্টেম্বর আমরা ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং আমাদের দেশের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে দখলদার শক্তির ব্যর্থতা উদযাপন করব। ইরাক প্রমাণ করেছে যে, বিদেশী শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিরোধ এবং জনগণের ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমেই এর সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব।’

অপরদিকে, ইরাকি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সেনা প্রত্যাহারের ফলে তেহরান ও তার শক্তিশালী মিত্ররা অবাধ সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। একইসাথে, এটি ইসলামিক স্টেটের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শত্রুদেরও পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে পারে।

ইরাকের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক এবং ইরানের মিত্র শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর গবেষণায় বিশেষজ্ঞ জাসিম আল-বাহাদলির মতে, “জোটের চলে যাওয়ার ফলে ইরান কৌশলগতভাবে লাভবান হবে; কারণ এর মাধ্যমে এমন একটি সামরিক উপস্থিতি সরে যাচ্ছে, যা বছরের পর বছর ধরে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে ‘একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করছিল’।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাকই একমাত্র দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের সাথেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক মিত্রতা বজায় রেখেছে; অথচ এই দুই পক্ষই মাঝেমধ্যে ইরাকের ভূখণ্ডকে নিজেদের মধ্যকার সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।

২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরে এক হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। এরপর ইরানের মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে বারবার হামলা চালায়, যার জেরে অনেক সময় পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটে।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এ পর্যন্ত নিহত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন ইরাকে। এদের মধ্যে সর্বশেষ জন ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন সার্জেন্ট, যিনি জুলাই মাসে ইরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন ধ্বংসের সময় প্রাণ হারান।

ইরানের ‘অক্ষশক্তি’র জয়
পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরে যেতে বাধ্য করাই নিজেদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে দাবি করে ইরান। তাই ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই সরে যাওয়াকে তারা পুরো অঞ্চলজুড়ে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ বিজয় হিসেবে দেখছে।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দাম সোমবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক ও এই অঞ্চল ত্যাগ করবে, তখন সেখানে ‘দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে’।

ইরানের পার্লামেন্টারি নিউজ সার্ভিসকে তিনি বলেন, ‘ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে স্বাগত জানায় ইরান এবং নিঃসন্দেহে এর প্রতি সমর্থন জানাবে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে এবং মাঝেমধ্যে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা ও তাদের মোকাবেলা করছে।’

ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে যে, ইরাকে ইরানের মদদপুষ্ট মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো তেহরানের নির্দেশে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে; যার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে চলতি মাসে সৌদি আরবের একটি প্রধান তেল পাইপলাইনে হামলার ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। বাগদাদ সরকার বলছে, তারা এসব গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।

সুন্নি মুসলিম শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনী ইরাকে আগ্রাসন চালায় এবং দেশটি দখল করে শিয়া-নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে; এরপর ২০১১ সালের শেষভাগে সেখান থেকে সরে আসার আগে তারা দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্রোহ-দমন অভিযানে লিপ্ত ছিল।

সূত্র : রয়টার্স