আরাশ-ড্রোন-ইরান-যুদ্ধ-প্রস্তুত
ইরানর তৈরি আরাশ ড্রোন। প্রেসটিভি

ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির সামরিক সক্ষমতায় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য ঘোরাফেরা করে হামলা চালাতে সক্ষম আরাশ ড্রোনে বড় ধরনের উন্নয়ন করা হয়েছে।

ইরানের ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি (২৫ সেপ্টেম্বর) জানায়, দেশটির সেনাবাহিনীর নির্বাহী বিষয়ক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলিরেজা শেখ এ কথা জানিয়েছেন।

ইরানের প্রতিরক্ষা খাতে সক্ষমতার বিভিন্ন উপাদান শক্তিশালী করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে জানান তিনি। ইরানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদ মাধ্যম দেফা প্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ বলেন, শত্রুপক্ষের ড্রোন ভূপাতিত করা এবং ইরানের আশপাশে তাদের উপস্থিতি সীমিত করার ক্ষেত্রে এসব সাফল্য এসেছে।

তিনি বলেন, শত্রুপক্ষকে আরো দূরে অবস্থান নিয়ে সেখান থেকে অভিযান চালাতে বাধ্য করা হয়েছে। তবে সেখান থেকেও অভিযান চালাতে গিয়ে তারা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

শেখ বলেন, 'এ ছাড়া আমরা আমাদের সক্ষমতাগুলো পুনর্বিন্যাস করেছি এবং আরাশ ড্রোনে বড় ধরনের উন্নয়ন এনেছি, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রে এটিকে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।'

তিনি বলেন, ইরানি বাহিনী অটল থাকবে, 'যতক্ষণ না বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের মিষ্টি স্বাদ আমরা উপভোগ করতে পারি।'

এই সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। ওই শক্তি দাবি করে, বিশ্বের সামরিক সক্ষমতার ৫০ শতাংশ তাদের হাতে রয়েছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'আমরা যুদ্ধক্ষেত্রেও দেখিয়েছি, জাতীয় ইচ্ছাশক্তি প্রযুক্তিকে পরাজিত করতে পারে।'

বর্তমান 'যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়' পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে শেখ বলেন, 'আমরা আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে এবং কৌশল, পদ্ধতি ও আচরণ পুনর্মূল্যায়নে কাজ করে যাচ্ছি।'

তিনি বলেন, 'সরঞ্জাম, অস্ত্র ও ব্যবস্থার যথাযথ সমন্বয় আমেরিকান-ইসরাইলি শত্রুর সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।' তার ভাষায়, তেহরান এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা প্রতিপক্ষের প্রযুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি তাদের ড্রোন ভূপাতিত করতেও সক্ষম।

ভবিষ্যতে হামলা হলে ‘নতুন কৌশলে’ তা বানচাল করা হবে : ইরানের সেনাবাহিনী

ইরানের সশস্ত্র বাহিনী 'নতুন সরঞ্জাম ও সামরিক কৌশল' ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। কোনো শত্রুপক্ষ আবারো আগ্রাসন চালানোর সাহস করলে পশ্চিম এশিয়া থেকে তাদের সিদ্ধান্তমূলকভাবে বিতাড়িত করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা।

জেনারেল শেখ আরো বলেন, ইরান কম খরচের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের ব্যয়বহুল গোলাবারুদের মজুত ক্ষয় করেছে এবং তাদের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

তিনি বলেন, 'প্রতিরক্ষা অর্থনীতির যুক্তির ভিত্তিতে আমরা শত্রুকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে এবং তার প্রতিরক্ষা-অর্থনৈতিক যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছি।'

যুদ্ধে প্রতিপক্ষের কতজন হতাহত হয়েছে, শুধু তার ভিত্তিতে যুদ্ধের ফলাফল বিচার করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন এই জেনারেল।

তিনি বলেন, 'আজ সামরিক ক্ষেত্রে শত্রুকে হতাহত করাই একমাত্র মানদণ্ড নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় শত্রুকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা যার রয়েছে, যুদ্ধের বিজয়ী সে-ই।' তিনি আরো বলেন, 'দীর্ঘমেয়াদি এই ক্ষয়যুদ্ধে আমরা শত্রুকে চ্যালেঞ্জ করেছি এবং দাবার ছকের একটি কোণে তাকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছি।'

ইরানে বর্তমানে পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের বাথপন্থী সরকারের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরুর স্মরণে এই সপ্তাহ পালন করা হয়। এ প্রসঙ্গে জেনারেল শেখ বলেন, 'আট বছরের পবিত্র প্রতিরক্ষার সময় আমরা দেখাতে পেরেছি, ইরান বৈশ্বিক হামলা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে আমরা প্রতিরোধব্যবস্থার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছি। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ৪০ দিনের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে আমরা বিশ্বকে আমাদের প্রতিরোধক্ষমতা এবং তা আরো সুসংহত করার সক্ষমতা দেখিয়েছি।'

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কৌশল ও তাদের সামরিক মতবাদ মোকাবিলার পাশাপাশি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেকে 'বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনের একটি শক্তিশালী শক্তি' হিসেবে প্রমাণ করেছে বলে জোর দিয়ে বলেন শেখ।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে আগ্রাসন শুরু করে। এর প্রায় আট মাস আগে দেশ দু’টি ইরানে বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়েছিল।

এর জবাবে ইরান দ্রুত পাল্টা হামলা চালায়। ইসরাইলের দখল করা ভূখণ্ডের পাশাপাশি অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থের ওপর দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান।

৭ এপ্রিল থেকে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র বহুবার লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে লক্ষ্য করে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের সর্বশেষ দফায় একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন।

জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার পরও এসব লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে। ওই স্মারকের প্রথম ধারাতেই সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

নতুন করে মার্কিন হামলা আবারো ইরানের পাল্টা হামলার সূচনা করেছে।