ছাত্রশিবির, গোলাম পরওয়ার
বক্তব্য প্রদান করছেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বাংলাদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদীদের একটি ক্লাব। গণতন্ত্র ও আওয়ামী লীগ একসাথে যায় না। ক্ষমতার বাইরে থাকলে দলটি গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করে, আর ক্ষমতায় গেলে নিজেরাই গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে হত্যা করে।

Advertisement

তিনি বলেন, বিএনপিও ক্ষমতায় এসে যে রাজনীতি শুরু করেছে, তাতে গণতন্ত্রের পথ আবার রুদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। সংসদকে কেন্দ্র করে সংসদীয় ফ্যাসিবাদ শুরু হয়েছে। বিএনপিকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পল্টন ট্র্যাজেডি স্মরণে এক আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথ হারিয়েছিল। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে দেশকে আবার গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসে জাতির কাছে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করছে। প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা ও গণতন্ত্রের পথে বাধা সৃষ্টি করে তারা আবার সেই পথ রুদ্ধ করতে চাইছে।

তিনি বলেন, ‘এই পথ হচ্ছে ফ্যাসিবাদের পথ, এই পথ হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যার পথ। তারা ছাড়া আর কেউ থাকবে না, তারা যা বলবে তাই বলতে হবে, এটার নামই হচ্ছে ফ্যাসিজম।’

গোলাম পরওয়ার বলেন, ২৮ অক্টোবরের রক্তের মধ্য দিয়ে শহীদরা যে পথে দেশকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ তা হতে দেয়নি; বরং ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই ফ্যাসিবাদের কবর রচনা করে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। বিএনপি হাজারো চেষ্টা করেও এই পথ ঠেকাতে পারবে না।

তিনি আরো বলেন, বাংলার ১৮ কোটি মানুষ সংগ্রাম করে শহীদ শিপন, মাসুদ ও জসিমদের রক্তভেজা এই দেশকে গণতন্ত্র, মানবিকতা ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে নেবে।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেদিন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী যখন মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সকাল থেকে আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও বামপন্থী সন্ত্রাসীরা গুলি, বন্দুক, লগি-বৈঠা নিয়ে মুহুর্মুহু হামলা চালাচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা দৃঢ়তা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের মঞ্চে পৌঁছাতে দেয়া হয়নি এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও যেতে দেয়া হয়নি। তারা নিজেরা দেয়াল ও ঢাল হয়ে সব আঘাত সহ্য করেছেন, শহীদ হয়েছেন; কিন্তু নেতাদের স্পর্শ করার সুযোগ দেননি। এর মধ্য দিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রমাণ করেছে, তারা জীবনের চেয়ে আখেরাতকে বেশি ভালোবাসে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ২৮ অক্টোবরকে কেন্দ্র করে সারা দেশে শিপন, মাসুদ, জসিমসহ প্রায় ৫৪ জনের শাহাদাত আল্লাহ কবুল করুন এবং তাদের জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আহতদের সুস্থতা কামনা করেন তিনি। একইসাথে শহীদদের স্বজনদের ধৈর্য ও প্রশান্তি দানের জন্য দোয়া করেন।

তিনি বলেন, আজকের ডাকসু নির্বাচন ও রাজধানীতে জামায়াতের আসন পাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইসলামের বিজয়ের পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। একসময় ছাত্রশিবিরের নেতারা বলতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেদিন বিজয় আসবে, সেদিন বাংলাদেশে ইসলাম বিজয়ী হবে।

আওয়ামী লীগ সরকারের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে বিল এনে রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার কন্যা শেখ হাসিনাও পল্টন ট্র্যাজেডি, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে জামায়াতের নেতাদের ফাঁসির আয়োজনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে ১৫-১৬ বছর ধরে নিষ্ঠুরতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে হেলিকপ্টার দিয়ে দেশের মানুষকে হত্যা এবং নিহতদের লাশ পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা না দিয়ে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা—দুজনকেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শেষে তিনি বলেন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনা ইসলামী আন্দোলনকে মৃত্যুভয়হীন চেতনায় উজ্জীবিত করেছে। শহীদদের আত্মত্যাগের শিক্ষা নিয়ে আন্দোলনের মাঠে থাকার তাওফিক কামনা করেন তিনি।

এ সময় আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন ছাত্রশিবির সভাপতি, জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. মোবারক হোসেন, ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম, ঢাকা ৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল সোহেল। আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরের ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।