নির্বাচন কমিশন, ঠাকুরগাঁও-১, উপনির্বাচন
নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা। নয়া দিগন্ত

নির্বাচন কমিশনের আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয় ১১-দলীয় প্রতিনিধিদল। ভোটের মাঠে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায় তারা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের আগে প্রশাসনিক কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রচারে বাধা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কমিশনের কাছে একাধিক দাবি তুলেছে দলগুলো। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, শুধু আশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Advertisement

বুধবার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে বসে ১১-দলীয় প্রতিনিধিদল। আলোচনায় ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কথা হয়। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পুরো কমিশন উপস্থিত ছিলেন। ১১ দলে নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।

বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে ব্রিফিং করেন ড. হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, আগের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কিছু পদক্ষেপের কথা বললেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। তাই ভোটের আগে আবারো লিখিতভাবে দাবি ও অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। আগামীকালের উপনির্বাচন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কার্যকারিতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কমিশন যে আশ্বাস দিয়েছে, ভোটের দিন তার প্রতিফলন না ঘটলে সেই আশ্বাসকে লোকদেখানো বলেই বিবেচনা করা হবে।

ইউএনওর দায়িত্বে থাকা নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিনিধিদলের অন্যতম প্রধান অভিযোগ, সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলামকে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার কথা বলা হলেও তাকে প্রশাসনিক পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তাকে নির্বাচনের আগে প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে দলগুলো।

প্রতিনিধিদলের বক্তব্য, কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক পদে বহাল থাকলে তার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থেকে যায় কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছে তারা।

তাদের যুক্তি, স্থানীয় ভোটার, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকেরা যখন জানবেন যে অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তা এখনো প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন, তখন নির্বাচনী পরিবেশে তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাবে। নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে সাময়িকভাবে বিরত রাখাই যথেষ্ট নয়; অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিনিধিদলের প্রশ্ন, কমিশন কি সত্যিই নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার বন্ধ করতে চায়, নাকি কেবল অভিযোগকারীদের আশ্বস্ত করেই দায়িত্ব শেষ করতে চায়? তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ভোটের আগেই প্রত্যাহার করতে হবে এবং অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।

হামলা, প্রচারে বাধা ও ভোটারদের নিরাপত্তা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে ১১-দলীয় প্রতিনিধিদল। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী এলাকায় হামলা, সন্ত্রাস এবং প্রচার কার্যক্রমে বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কারা আক্রান্ত হয়েছেন, কখন ও কোথায় হামলা হয়েছে এবং কারা জড়িত—তা উল্লেখ করে একটি তালিকা কমিশনের কাছে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিনিধিদল।

প্রতিনিধিদের দাবি, এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, কমিশনের কাছে তার স্পষ্ট জবাব চাওয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় সহিংসতা ও ভয়ভীতির পরিবেশ থাকলে ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা।

বিশেষ করে হিন্দু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিনিধিদল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছেন। তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হুমকির অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

প্রতিনিধিদলের বক্তব্য, ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা প্রার্থীর সমর্থক হওয়ার কারণে কোনো ভোটার যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সংবিধানের সপ্তম ভাগে নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাংবিধানিক কাঠামোর আলোকে কমিশনকে নিজের দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে হবে।

সেনা মোতায়েনের দাবি
নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের আস্থা বাড়াতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন হামিদুর রহমান আযাদ। তার বক্তব্য, কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। কিন্তু অতীতের ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার কারণে এসব বাহিনীর ওপর ভোটারদের আস্থার প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করে দলগুলো।

প্রতিনিধিদলের মতে, তুলনামূলকভাবে সেনাবাহিনীর ওপর এখনো মানুষের আস্থা রয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় সেনা সদস্যদের উপস্থিতি থাকলে ভোটাররা কিছুটা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যেতে এবং নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। তিনি বলেন, তাই শুধু বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যা ও উপস্থিতির কথা না বলে, ভোটারদের নিরাপত্তা ও আস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে ১১ দল।