আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আলী আহমদ মাবরুর
আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ও তার ছেলে আলী আহমদ মাবরুর। সংগৃহীত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের শাহাদাত ও দাফনের কথা স্মরণ করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন তার ছেলে আলী আহমদ মাবরুর। বাবার দাফনের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট করেছেন তিনি।

Advertisement

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) তিনি তার ফেসবুক পেজে ওই পোস্টে লেখেন, ‘শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার জানাজায় তার পরিবার অংশ নিতে পারেনি। শহীদ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানের পরিবারও সেই সুযোগ পায়নি। তৃতীয় সিরিয়ালে ছিলেন আমার আব্বা। আমরা ডেসপারেটলি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যা হওয়ার হবে, আমরা এলাকায় যাবো। জানাজায় শরীক হবো। কিন্তু ঢাকায় ফাঁসির আগে ও পরে পরিস্থিতি অনেকটাই কঠিন হয়ে গেল।’

তিনি আরো লেখেন, ‘আবার এলাকা থেকেও খবর আসছিল, আগেরদিন সন্ধ্যার পর থেকেই দাফনের এলাকার আশপাশ পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন অবরোধ করে রেখেছে। কাউকে ঢুকতে বা বের হতে দিচ্ছে না। অবস্থা এমন হয়ে গেল যে, কেউ হয়তো মাগরিবের নামাজ পড়েছে মসজিদে। এরপর বের হয়েছে পরেরদিন ফজর বাদ জানাজা আদায় করার পর।’

আলী আহমদ মাবরুর লেখেন, ‘এদিকে আমরা ঢাকা ছেড়ে রওয়ানা দিয়ে পথে পথে বাধা মোকাবেলা করেছি। আমরা জেল থেকে বের হয়ে ঢাকার বাসাতেই যাইনি। কারণ আমাদের আশঙ্কা ছিল, স্থানীয় আওয়ামী লীগ বা পুলিশ এমন সিচুয়েশন তৈরি করে ফেলবে যে, আমরা আর বেরই হতে পারবো না। এসব ভেবে আমরা কারাগার থেকে বের হয়ে সোজা ফরিদপুরের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়ে দিলাম।’

তিনি লেখেন, ‘আমরা খবর পাচ্ছিলাম, ফরিদপুরের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের একাংশ আব্বার লাশ ফরিদপুরে দাফন হতে না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। আর যেহেতু সরকারও চায়নি, ঢাকার কোথাও দাফন হোক, তাই ফরিদপুর ছাড়া আর কোনো অপশন তাদের সামনে ছিল না। আর তাই হয়তো আওয়ামী লীগই দলীয় সিদ্ধান্তে ওই গ্রুপকে ঠান্ডা করেছে। বলাই বাহুল্য, আমাদের এখানে কারো উত্তেজিত হওয়া বা না হওয়া অনেকটাই নির্ভর করে দূর থেকে চালানো রিমোটের ওপর।’

মাবরুর লেখেন, ‘যাই হোক, সকল বাধা ও প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে আমরা দাফনস্থলের কাছাকাছি গিয়ে চূড়ান্ত বাধার মুখে পড়লাম। কোনোভাবেই পুলিশ আমাদের যেতে দেবে না। তারা ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। পরে আমরা নানা কৌশলে প্রতিবেশীদের বাড়ির উঠোনের মধ্যে দিয়ে দাফনের জায়গায় গিয়ে পৌঁছাই। তখন সম্ভবত রাত আড়াইটা বাজে।’

তিনি লেখেন, ‘স্থানীয় জামায়াত নেতারা জানিয়েছিলেন, যাতে আমরা সরাসরি দাফনস্থলে চলে যাই। কারণ দেরি করলে বা প্রথমে বাড়ি গিয়ে পরে আসতে চাইলে তখন হয়তো আর যাওয়াই যাবে না। আমাদের সাথে আম্মাসহ পরিবারের নারী সদস্যরাও ছিলেন। তারাও আমাদের সাথে তাই আটকা পড়ে যান। দাফনস্থলের পাশে যে মাদরাসা ছিল, সেখানকার বিভিন্ন ঘরে তারা নির্ঘুম রাত পার করলেন। আমার ছেলের বয়স তখন মাত্র আড়াই মাস। নভেম্বরের সেই শীতের রাতে, ওকে নিয়ে ওর মা, আমি কী একটা দুঃসহ রাত আমরা পার করেছি। এরও ঘণ্টাখানেক পর আব্বা আসলেন। আমরা বুকে পাথর বেধে তার লাশ রিসিভ করলাম। উষ্ণ রক্ত তখনো পুরো কফিন জুড়ে, তাকে মোড়ানো প্লাস্টিকে রক্তের ফোঁটা সবখানে। যে মানুষটাকে কয়েক ঘণ্টা আগে আলিঙ্গন করে আসলাম, মুসাফাহ করে আসলাম, তাকে লাশ হিসেবে রিসিভ করতে সন্তান হিসেবে কী অনুভূতি হয়েছিল, তা প্রকাশ করা কখনোই সম্ভব নয়।’ 

‘সাম্প্রতিক নানা ঘটনা পড়তে গিয়ে এই স্মৃতিগুলো বারবার মনে পড়ছে।’—পোস্টের শেষে এই কথা উল্লেখ করেন আলী আহমদ মাবরুর।