
আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, হুবহু সেই পথেই বর্তমান সরকার হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘বিএনপি জনগণকে মূর্খ মনে করে এবং অবমূল্যায়ন করে। তারা নিজেদেরই শুধু জ্ঞানী মনে করে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হাত দিয়েছে সরকার। বিরোধী দলের সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্যতা সরকারের নেই। আজ থেকে সরকারকে নয়, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে বিরোধী দল।’
রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই সনদের ১ বছর : প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বক্তব্য দেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘ছাত্ররা মেধার অধিকার আদায় করতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। মেধার ভিত্তিতে প্রত্যেকে নিজের যোগ্য স্থান নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। তারা রাষ্ট্রকে সেবা দিতে চায়। সেই সুযোগ তৈরি হয় পিএসসির মাধ্যমে। একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন পিএসসিতে হাত দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের প্রভাব খাটিয়ে পিএসসির সদস্যদের পদত্যাগ করতে বলা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এটি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয়। কোনো মন্ত্রীর এ কথা বলার অধিকার নেই। চাকরির এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি এখন পুরোপুরি দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে পরিপূর্ণ করতে চায় সরকার।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘সরকারি দলের ২০০ জন সংসদ সদস্যের আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, অথচ বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যকেও সেই বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এই বৈষম্যের জন্যই কি এতগুলো জীবন গেল? এ জন্যই কি আমাদের চব্বিশের জুলাই বিপ্লব হয়েছিল? জুলাই বিপ্লব হয়েছিল পরিবর্তনের জন্য, বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনা করে নতুন রাজনীতির সূচনা করার জন্য। জনগণ এমনটাই আশা করেছিল। কিন্তু আবারো দেশটাকে সে দিকেই টেনে নেয়া হলো।’
তিনি বলেন, ‘সাত মাসেই রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, হুবহু সেই পথেই এ সরকার হাঁটছে। বিরোধী দল কি গালে আঙুল দিয়ে বসে থাকবে? শত ইঞ্জিনিয়ারিং ও চুরি-চামারির পরও জনগণ তাদের যে কয়টি আসন দিয়েছে, সেই আসনগুলোর ৮৯ জন সংসদ সদস্য সারা দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবেন, ইনশাআল্লাহ।’
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি, বিএনপি বদলে গেলেও আমরা আমাদের কথা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় আমরা আদায় করেই ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’
তাদের বহু লোভ দেখানো হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর দিকে তাকাননি; প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেও জানান তিনি। যার ইচ্ছা, সে জাতির সাথে প্রতারণা করুক। তবে হিমালয় পর্বতের মতো অটল থেকে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবে বিরোধী দল।
তিনি বলেন, তাদের আন্দোলন কোনো দলের জন্য নয়; প্রতিটি দাবি জনগণের জন্য। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করা, বৈষম্যহীন সমাজকাঠামো গড়ে তোলা এবং মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এ আন্দোলন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ মসৃণ ও বাসযোগ্য করার জন্যই তাদের এ আন্দোলন। কোনো ধরনের চোখরাঙানিকে তারা পরোয়া করবেন না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তারা দেশকে ভালোবাসেন। জ্বালাও-পোড়াও তাদের আন্দোলনের কর্মসূচি নয়। চব্বিশে সন্তানেরা দেখিয়ে দিয়েছে, জ্বালাও-পোড়াও লাগে না। খালি হাতে ঈমানি বল ও দেশপ্রেম বুকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদের পতন হয়। এটি তাদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। এ পথ ধরেই তারা এগিয়ে যাবেন এবং নব্য ফ্যাসিবাদের পতন হবে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, তারা বিএনপির পতন চাননি; বরং সফলতা চেয়েছিলেন। কারণ, বিএনপির সফলতা মানে দেশের সফলতা। তিনি ঘোষণা দেন, তারা ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবেন। এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলের সহযোগিতা নেয়ার যোগ্যতা তাদের নেই।
ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, “বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও বাস্তবে সবার আগে বাংলাদেশ নয়; তারা নিজেদের, নিজেদের পরিবার, সন্তান, ভাগনে, ভাতিজা, শ্বশুর ও স্ত্রীকে আগে রাখছে। তারা সিন্ডিকেটের হাতে প্রিয় বাংলাদেশকে তুলে দেবেন না। এ দিন শেষ। যুবকেরা জেগে উঠেছে। পূর্ণমুক্তি না আসা পর্যন্ত তারা ঘুমাবে না।” যুবকদের সাথে আরো শক্তিশালী হয়ে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সরকারের মুখে অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আশ্বাস শুনতে শুনতে জাতি বিরক্ত হয়ে গেছে। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, তা তারা কল্পনাও করেননি। শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘সরকারকে বুঝতে হবে জনগণ কী চায়। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘জুলাই সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল এবং রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা। রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার কারণেই ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানে এগিয়ে এসেছিল। বিএনপি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের ক্ষেত্রে দ্বৈত অবস্থান নিয়েছে। সরকার গঠনের ফলাফল মেনে নিলেও গণভোটের রায় উপেক্ষা করছে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সাথে প্রতারণা করেছে এবং সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে।’ তার মতে, সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি ছিল সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘২০২৪ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই সনদ। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এর মৌলিক উদ্দেশ্য।’
সভায় উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এ বি এম খালিদ হাসান, মো: আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, বরিশাল সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা, গণপরিবহনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, সড়ক ও যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী এম শাহেদুল ইসলামসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








