নয়া দিগন্ত
কথা বলছেন শহীদ মীর কাসেম আলীর মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়া। নয়া দিগন্ত

২৫ অক্টোবর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই উপলক্ষে বিশেষ একটি সাক্ষাৎকার নেয়া প্রয়োজন। পত্রিকাটির স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ মীর কাসেম আলীর পরিবারের কেউ হলে ভালো হয়। অফিসের পক্ষ থেকে আমাকে বিষয়টি বিশেষভাবে তাগিদ দেয়ায় আমি পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলাম। খন্দকার আয়েশা খাতুন যিনি ছিলেন মীর কাসেম আলীর নেপথ্য অনুপ্রেরণা—তিনি অসুস্থ থাকায় এবং গুম থেকে ফিরে আসা তার ছেলে মীর আহমদ বিন কাসেম অর্থ্যাৎ ব্যারিস্টার আরমান এমপি দেশের বাইরে সফরে থাকায় মোবাইলফোনের মাধ্যমে আমি কথা বলি প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের সুযোগ্য মেয়ে সুমাইয়া রাবেয়ার সাথে। নয়া দিগন্ত থেকে বলছি, জেনে তিনি আপ্লতু হলেন। বিকেল ৫টার জন্য শিডিউল ঠিক হল। ইতোমধ্যে কিছু হোমওয়ার্ক সেরে নিলাম। আমরা অধিক আগ্রহে অপেক্ষা করছি! তিনি এলেন এবং স্বাভাবিক মোয়ামেলাত ও মাগরিবের নামাজান্তে আমরা স্টুডিওতে তাশরিফ রাখলাম। শুরু হল বাক্যালাপ। সেই আলাপের লিখিতরূপ নিচে তুলে ধরা হল। —তাসনীম মাহমুদ   

Advertisement

আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম।

কেমন আছেন? 
আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো। বিশেষভাবে পরিচিত, স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ার মতো জায়গায় এসে খুব বেশি ভালো লাগছে। 

আপনি যেখানে বসে কথা বলছেন সেটি আপনার বাবা শহীদ মীর কাসেম আলীর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। ঠিক এই মুহূর্তে আপনার কেমন লাগছে?
আসলে অনেক বেশি স্মৃতিবেদনাতুর লাগছে। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, শুধু আব্বুর প্রতিষ্ঠান বলে না—আমাদের বেড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেই। আমাদের ছোটবেলার স্মৃতি এগুলো। মানুষের এমন থাকে যে, বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়। আমাদের হচ্ছে আব্বুর কাজগুলোতে, তার স্বপ্নগুলোতে ছুটির দিনে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যেতেন তিনি। আমি এখানে আসতে আসতে বলছিলাম, এই জায়গা-জুরাইন আমার জন্য বেশি স্পেশাল ছিল। আব্বুকে গ্রেফতারও করা হলো নয়া দিগন্তের প্রাঙ্গণ থেকে। তো শুরু এবং শেষের অর্থ্যাৎ টক-ঝাল-মিষ্টি মিশ্রণ এই জায়গাটা আমার জন্য। 

তিনি যখন পরিকল্পনা করতেন তখন পরিবারের সাথে আলোচনা করতেন কি-না, করলে কোন ধরনের আলোচনা করতেন? 
আমার কাছে মনে হয় কি—উনি হঠাৎ করে স্বপ্ন দেখছেন ব্যাপারটা এমন না। এটা মনে হয় অনেক অনেক বছর অর্থ্যাৎ উনি যখন সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলন শুরু করেছিলেন তখন থেকেই হয়তো এই জিনিসগুলো তার মধ্যে ছিল। তিনি কিন্তু খুবই সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। আম্মুকে বিয়ে করার একটা বড় কারণ ছিল যে- আম্মু সাহিত্য চর্চা করতেন, লেখালেখি করতেন। আম্মু বলতেন, আব্বু খুবই সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। গান, লেখালেখি পছন্দ করতেন। তিনি নিজে এগুলো পারতেন না। মানে তার সৃষ্টিশীল লেখনীর হাত একেবারেই ছিল না। গান গাওয়ার চেষ্টা করতেন! তার বেসুর গলা আমাদের সহ্য করতে হত। তিনি কালচার খুবই ভালোবাসতেন এবং এটাকে বিকশিত করতে খুবই পছন্দ করতেন। আমরাও বড় হয়েছি সাংস্কৃতিক পরিবেশে। 

এসব যে তার নতুন করে স্বপ্ন বা হঠাৎ করে একটা বিজনেস আইডিয়া এটা কিন্তু না। অনেক আগে থেকেই যখন তিনি সমাজ বিনির্মাণ বুঝতে শুরু করলেন এবং এটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বুঝতে পারলেন তখন থেকেই তার মাথায় এগুলো কাজ করেছে। আরেকটু সহজ করে যদি বলি, নয়া দিগন্ত শুধু একটি প্রকল্প ছিল না। এটি তার বিশাল সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পরিকল্পনা ছিল। আসলে প্রত্যাশা প্রাঙ্গণ ছিল মতিউর রহমান মল্লিককে সাথে নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা।

নয়া দিগন্ত শুরুর সময়ের বিশেষ কোনো স্মৃতি আপনার মনে পড়ে কিনা?
রমজান মাস ছিল। শুরুর দিন যখন পত্রিকাটি প্রকাশিত হবে সেদিন আব্বু রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত সশরীরে প্রিন্টিং দেখছিলেন। ওখানেই নামাজ পড়েছেন, সবার জন্য রান্না করা খাবার একই সাথে খেয়েছেন। বাসায় আসার পর আব্বু মজা করে বলেছিলেন, প্রিন্টিংয়ের সময় এমন হয়েছে, যান্ত্রিকত্রুটির কারণে কিছু প্রিন্ট হয়ে বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তো আব্বু তারাবির নামাজে সেজদার সময় ভাইব্রেট টের পেলেই বুঝতেন যে প্রিন্ট হচ্ছে।   

আপনার বাবার যে ঐতিহাসিক পথচলা, ওই পথচলার নেপথ্য কারিগর হিসেবে আপনার মায়ের অবদান কেমন ছিল? 
আব্বু জানতেন, বিকশিত করার যোগ্যতা তার আছে। কিন্তু কি বিকশিত করতে হবে এই জিনিসটা তার ছিল না। সুতরাং পছন্দের জায়গায় তিনি বুঝেছিলেন যে- আম্মু তাকে পথ দেখাবেন, তিনি তাকে পরামর্শ দেবেন, তার খোরাক জোগাবেন। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি আব্বু-আম্মুর মিশ্রণটা আল্লাহর একটি পরিকল্পনা এবং এই মিশ্রণটা না হলে আব্বু, আব্বু হয়ে উঠতেন না অথবা আব্বুর কোনো প্রকল্প আসলে ওভাবে জীবন্ত হয়ে উঠত না। সুতরাং যথাযথ পার্টনার বেছে নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাইরের মানুষের কাছে তিনি যেমন হিরো ছিলেন, পরিবারের কাছেও তিনি তেমনটাই ছিলেন।

একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি আপনার বাবাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? 
আমি নিজেকে অনেক স্পেশাল মনে করি এজন্য যে, আল্লাহ আমাকে এভাবে পছন্দ করলেন এমন একজন মানুষের এবং এমন একটি জুটির পরিবারে আনার। আলহামদুলিল্লাহ। মানুষ হিসেবে তিনি খুব সহজ, সরল ছিলেন। দেশীয় সবকিছুই তিনি অনেক বেশি পছন্দ করতেন, সাধারণত মানুষের ভিতরে এটা দেখা যায় না। হয়তো আব্বুকে তখনকার দিনে অনেকে মনে করেছেন—তিনি বিজনেস পছন্দ করেন, টাকা-পয়সা পছন্দ করেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকারের ১৭ বছরে আমাদের যে কষ্টের জায়গাটা ছিল সেখানে আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝেছি, কেন প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দরকার ছিল। প্রকৃতপক্ষে, পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে মূল্যায়নের ভাষা আমার জানা নেই। কি বলব, খেই হারিয়ে ফেলছি।

আপনার বড় ভাই ব্যারিস্টার আরমানকে যখন গুম করা হল তখন আপনাদের পরিবারের মনস্তাত্বিক লড়াইটা কেমন ছিল? 
আমরা জানতাম আব্বুর বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে ইউনিটি ছিল। আমাদের ভাই, আমি, আব্বু, আম্মু, আমরা সবাই মিলে একসাথে মাশওয়ারা করতাম। আমার বড় ভাই বিজনেস অরিয়েন্টেড ছিলেন। ছোট ভাইয়া প্রবলেম সলভিং ছাড়াও আব্বু চলে যাওয়ার পরে আমাদের লাইফটাকে খুব বেশি গাইড করতেন। আব্বু জেলে থাকতে আমাদের কোনো কষ্ট পেতে দেননি। এটি ব্যতিক্রম ছিল। ফাইনালি আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে—আব্বু চলে গেলেন, ভাইয়াকেও নিয়ে গেল। আমাদের পানিতে পড়ার মতো অবস্থা হল। সাঁতার জানেন না এরকম মানুষ পানিতে পড়লে যা হয়। ব্যাপারটা এমন যে, আপনাকে হাত-পা বেঁধে দিয়ে পানিতে ফেলে দেয়া হল। আমি সত্যিই অবাক যে, আল্লাহই আমাদের দেখে রেখেছেন। না হলে—ভাবি, আম্মু, আমি বা আমাদের কেউই  জব করছি না, অন্যদিকে আব্বুর সাথীরা সবাই যে খুব বেশি হেল্প করেছেন ব্যাপারটা এমনও না। আসলে সময়টা স্বাভাবিকভাবে বলে বোঝানো সম্ভব না।

আমার আম্মু সূরা ইউসুফ গবেষণা শুরু করলেন। কারণ তার কাছে মনে হচ্ছিল যে, একই প্রক্রিয়া এবং সুবহানাল্লাহ আপনি যদি এখন দেখেন, শেষের প্রক্রিয়াটা আমরা কখনো চিন্তা করিনি। আম্মুর কাছে হযরত ইউসুফ (আ:) এর ওই কুয়াতে পড়ে যাওয়া এবং তার পরের প্রক্রিয়াটুকুই মুখ্য ছিল। ভাইয়া একটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বা একটা লিডারশিপ পজিশনে চলে যাওয়া এটা আল্লাহর একটা মিরাকেল। ওই সময়টাতে যখন তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন আসলে এটার মধ্যে কি কারণ থাকতে পারে, আল্লাহর কি পরিকল্পনা, অনেক ব্যাখ্যা, অনেক কিছু বিভিন্নভাবে আম্মু ব্যাখ্যা করতেন এবং আমাদের সারাক্ষণ এটির তাফসির করতে বলতেন। আমাদেরকে বলতেন যে, আমি একটি নতুন কারণ পেয়েছি। কোনো একটি আয়াত এরকম ছিল যে, আল্লাহর কাছে সরাসরি চাইনি যে আমার ছেলেকে ফেরত দাও। তারপরে আমাদের প্র্যাকটিস চেঞ্জ হয়ে গেল। রাত জেগে, তাহাজ্জুদে আমরা আল্লার কাছে সরাসরি চাওয়া শুরু করলাম। শুরু হয়ে গেল আল্লাহকে কনভিন্স করার চেষ্টা। 

আপনারা দৃঢ় ছিলেন যে ব্যারিস্টার আরমান বেঁচে আছেন, তাই না? 
এই আশা না থাকলে তো বেঁচে থাকা যায় না। আশা নিয়েই তো আল্লাহর কাছে তার ফিরে আসার জন্য দোয়া করছিলাম।

তার ফিরে আসার খবরে আপনাদের পারিবারিক অনুভূতি সম্পর্কে বলবেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা কেউ বিশ্বাস করিনি। একবার এরকম খবর আসে যে, তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ওই জায়গায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমরা হতাশ হয়েছি। সুতরাং একটা অনেক বড় সময় আমাদের চলে গেছে বুঝে উঠতে যে, সত্যিই ভাইয়া এখানে। অনুভূতিটা কিভাবে যে বোঝায়—বাবাকে আমার সামনে থেকে নিয়ে যাচ্ছে এবং আমি জানি ওনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে, এই একটা অনুভূতি আর ভাইয়া ফেরত আসার পরের অনুভূতি এই দুই অনুভূতির আসলে আমার কাছে কোনো ওয়ার্ড নেই। ভাইয়াকে যে অবস্থায় আমরা পেয়েছি, ভাইয়ার হাড্ডি ছাড়া কিছুই ছিল না শরীরে। তিন মাস ভাইয়াকে আমি মালয়েশিয়াতে আমার কাছে রেখেছিলাম এবং তিনি খুব ক্যাজুয়ালি ছোট ছোট করে আয়নাঘরের ঘটনা বলে ফেলতেন। বলে তিনি উঠে গেলে আমরা জায়গা থেকে আর নড়তে পারতাম না এ জন্য যে, এটা আমার ভাইয়ের সাথে ঘটেছে। অতি প্রিয়জনদের এই বিষয়গুলো যখন সামনে আসে তখন তো আসলে মেনে নেয়া খুব কঠিন।

শহীদ মীর কাসেম আলী প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তার সন্তানরা অর্থ কষ্টে ভুগেছেন। বিষয়টি ভাবলে আপনার কেমন লাগে?
এখানে প্রথম কথা হচ্ছে আমি যেটা বলব, আমরা কখনো কোনো আশা নিয়ে থাকিনি। কারণ আব্বু সবসময় কাজগুলো ফি-সাবিলিল্লাভাবে করেছেন এবং এটি সত্য যে, আব্বুও বলেছেন, এগুলো আমার সম্পত্তি না। ইবনে সিনা, ইসলামী ব্যাংক কোনো কিছুতে আমাদের লিখিত কোনো শেয়ার ছিল না। কিন্তু আব্বুর বিশ্বাস ছিল যে, তারা দেখভাল করবে। তারা হয়তো বলতে পারেন, দেখভাল করেছেন কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। 

বিচারিক হত্যার রায় দেয়া হলে আপনাদের পরিবারের মনস্তাত্বিক পরিবেশ কেমন ছিল?
আমরা শেষ দিন পর্যন্ত আশাবাদী ছিলাম। কারণ আগে থেকে যদি নেগেটিভ হয়ে যাই তাহলে তো আসলে জীবন চলা খুব কঠিন হয়ে যায়। আব্বু অনেক পজিটিভ ছিলেন। আব্বু বলতেন, আল্লাহ আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করলে আলহামদুলিল্লাহ। আব্বু না থাকলে আমরা কি করব ধরনের কোনো আলোচনা আমাদের কখনো হয়নি। আমরা চিন্তাও করিনি যে কি হবে! 

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে আপনার বাবার অবদানকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আমি ঠিক জানি না এই জায়গাতে তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করব। আসলে অনেক সময় এমন হয় যে, অনেক কিছু জানা থাকলেও বলা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবু যদি চিন্তা করি আন্ডাররেটেড বললেও কম হবে। বাবার উসিলায় আমরা বাংলাদেশের এমন এমন প্রান্তে গিয়েছি যেখানে ইলেকট্রিসিটি নেই। ডিঙ্গি নৌকায় করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন গিয়েছি। ওই জায়গাটা যে একটা ট্রাভেলিং হাব হতে পারে এটা কারো মাথায় কল্পনা করা যেত না। সবাই জানে, কেয়ারি সিন্দাবাদের কথা। এরকম একজন মানুষকে ইকোনমিকলি একটা কান্ট্রির, একটা সোসাইটির কি মূল্যায়ন করা উচিত এটা বলার অপেক্ষা রাখে না অথচ তাকে দেশদ্রোহিতার তকমা লাগিয়ে মেরে ফেলা হল। তার মূল্যায়ন কেমন করা উচিত এটার আসলে কোনো উত্তর নেই আমার কাছে।

২০১৩ সালে যখন এই পত্রিকার অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হয় তখন আপনাদের কেমন লেগেছে?
আমাদের বাসায় আগুন দেয়ার মতোই মনে হল। আব্বুর প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠান আমাদের পরিবারের মতো। আমরা বেড়ে উঠেছি এখানে। অনেক বেশি কষ্ট লেগেছে। আব্বু তখন কারাগারে। তার খুব টেনশন ছিল সবাই সেফ আছেন কি-না, কোনো হতাহত হয়েছে কি-না। একটা ব্যাপার ছিল আব্বুর, তিনি যে টিম সে রেখে গেছেন তাদের ব্যাপারে তার খুব বিলিফ ছিল। 

২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন? 
মূল্যায়নটা আমি দু’ভাবে করতে চাই। এক হচ্ছে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং সমাজ বিনির্মাণের একজন কর্মী হিসেবে। আমরা সবসময় চেয়েছি স্বৈরাচার মুক্ত হোক। সবচেয়ে বড় কথা একটা মেজরিটি মুসলিম কান্ট্রি যেখান থেকে মোহাম্মদ বিন কাসেমসহ বড় বড় অনেক ইসলামী যোদ্ধা তৈরি হয়েছে, এই জায়গায় আমরা সত্যিই আশা করছিলাম যে—আমরা এই আইডেন্টিটিটাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করব। এটাকে কেউ আঙ্গুল তোলার সাহস পাবে না। আমি সত্যই এই জায়গাতে বিশ্বাস করতাম, বাট আনফরচুনেটলি আমরা দেখছি যে, কিছু মানুষ ক্ষমতার চিন্তা করে, নিজের জমিনকে বিকিয়ে দেয়াকে কোনোভাবেই সমস্যা মনে করছেন না। এটা বোকামি ছাড়া কিছু না। আলহামদুলিল্লাহ! আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের মানুষদের মধ্যে যতদিন পর্যন্ত এক ইঞ্চি ঈমান বাকি আছে তারা লড়ে যাবে। আর পলিটিক্যাল সাইন্টিস্ট হিসেবে আমার যে ব্যাখ্যা সেটি আবার পজিটিভ। সেটা পজিটিভ কারণ, পোস্ট রেভুলেশনের কান্ট্রিসগুলোতে দেখেছি এবং তাদের পোস্ট রেভুলেশনের ইকোনমি, পোস্ট রেভুলেশনের সিকিউরিটি, রিয়েলিটি সেদিক থেকে বাংলাদেশ আমেজিংলি ভালো করছে। এবং যে ভয়টা আমি পেয়েছিলাম একটা এনার্কির ভয়, সেটা কিন্তু ইন্টারিম গভর্মেন্টের কারণে ভয়ঙ্কর একটা ব্ল্যাক হোলে বাংলাদেশকে পড়তে হয়নি। 

আপনি দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে মিডিয়া সংস্কৃতিতে ডানপন্থীদের বাস্তব অবস্থা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? 
করুন! কিছুদিন আগে একটা রেফিউজি দেখছিলাম যে, ভিয়েনাতে ডিঙ্গি নৌকায় ভেসে থাকার চেষ্টা করছে। আমরা সেই অবস্থায় আছি, মানে আপনি ছবিটা ঠিক এমন একটা জায়গায় থ্রো করেছেন যেখানে গভীর সমুদ্র, অথই সমুদ্র—মাঝখানে একটা ডিঙ্গি নৌকা। কোনো গন্তব্য নেই এবং তারা জানে না যে সামনে কে...। কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো গোল নেই। সত্য বলতে, ডানপন্থীদের ইউনিফিকেশন নেই। সেকেন্ড কথা হচ্ছে, যতটুকু করতে চায় সেখানে পজিশন এবং পাওয়ার এই জিনিসগুলোই আগে আসছে এবং এটা বলতে আমার কোনোই সংকোচ নেই যে, পাঁচ আগস্টের এতো ইনিশিয়েটিভ নেয়া হয়েছে যেগুলো শুধুমাত্র এইসব উইয়ার্ড কম্বিনেশনের কারণে ভেঙে গিয়েছে।   

ডানপন্থীদের সমস্যা হচ্ছে আমরা খুব বাইনারি ইসলামকে বিলিভ করি। এর পরের ইসলামটাকে আমরা বিশ্বাস বা বুঝতে পারি না। আপনি যদি টার্কিতে যান এত সেকিউলার একটা কান্ট্রি কিন্তু আপনি যদি কিছু কেনেন, ওরা বলবে আল্লাহ রাজি অলসন অর্থ্যাৎ আল্লাহ তোমার ওপর খুশি হোক। 

আপনার বাবার কোন আচরণটি মেয়ে হিসেবে মনে পড়লে নিজেকে ধরে রাখতে কষ্ট হয়? 
বলা খুবই কঠিন কিন্তু আব্বুর একটা মজার জিনিস ছিল সেটা হচ্ছে যে, তিনি মেয়েদেরকে ছেলেদের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতেন। এই জিনিসটা আমার কাছে এখন খুবই কষ্ট লাগে। আমার দুনিয়াতে আব্বু আমাকে খুব বেশি আদর করে ফেলেছেন। আব্বুর শাসন খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। তিনি রেগে গেলে বাড়ি আসার সময় বিভিন্ন ধরনের জিনিস নিয়ে আসতেন। আমরা অপেক্ষা করতাম আব্বুর রাগ হোক। কেননা রাগ হলেই আমরা কিছু পেতাম। 

আব্বু সৌখিন মানুষ ছিলেন। খুবই সৌখিন। আয়নার সামনে দাঁড়ালে আব্বুর কথা মনে পড়ে যায়। আমি এখনো যে আংটিগুলো, যে ড্রেসগুলো পরি সেগুলো আব্বুর এনে দেয়া। 

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের মেয়ে হিসেবে নয়া দিগন্তের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?
দেখেন, তিনি যখন নয়া দিগন্ত শুরু করেছিলেন তার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি এটা রিয়েলাইজ করেছিলেন যে, আমাদের কথাগুলো সত্য হলেও অন্য কেউ বলবে না। তিনি বারবার সবার কাছে বলছিলেন, আমরা শুধু সত্যটা বলতে চাই, আমরা আমাদের কথা বলতে চাই না, সত্য বলতে চাই। 

আমি নয়া দিগন্তর পরিবারের কাছে বলব যে, অনেক কঠিন একটা বাস্তবতা আপনারা পার করে এসেছেন। আমাদের মন থেকে আপনাদের জন্য দোয়া। আমি বিশ্বাস করি এর চেয়ে অনেক সামনে এগিয়ে যেতে পারবেন আপনারা। 

নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন। 
আমি জানি, যখন পত্রিকাটি শুরু হয়েছিল তখন এর কাছে আপনাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। ওভার দা ইয়ারস হয়তো তার মান বা তার যে মেসেজ আপনারা দেখতে চেয়েছিলেন সেই জিনিসগুলো পাননি, অনেকে মনক্ষুন্ন হয়ে দূরে সরে গেছেন, অনেকে হয়তো অনেক কমপ্লেন করছেন কিন্তু আমি আপনাদের কাছে রিকোয়েস্ট করব যে, যখন একটা কিছু কঠিন জায়গায় থাকে তখন আপনাদের সাপোর্ট সবচেয়ে বেশি দরকার। 

প্লিজ আবার নতুন করে নয়া দিগন্তকে ভালোবাসুন। যদি অন্য কোনো পত্রিকা ভালো লাগে তার সাথে নয়া দিগন্তও কিনুন, সাথে থাকবেন, আপনাদের ভালোবাসা পেলে নয়া দিগন্ত আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে পারবে।