সাক্ষাৎকার
নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুম খলিলী। নয়া দিগন্ত

২৫ অক্টোবর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই উপলক্ষে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক মাসুম খলিলী’র একটি নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়া প্রয়োজন। শিফট ইনচার্জ সাবরিনা সোবহান কয়েক দফা দৌড়-ঝাঁপ করে শিডিউল ঠিক করার চেষ্টা করলেন। উনার ব্যস্ততা দেখে শিফট ইনচার্জ আমাকে শেষবারের মতো একবার চেষ্টা করে দেখতে বললেন। আমার অনুরোধে উনি রাজি হলে আসরের নামাজান্তে ডিজিটাল বিভাগের মাহমুদুল হাসান, ক্যামেরাম্যান এবং আমি তার চেম্বারে হাজির হলাম। শুরু হলো আলাপচারিতা। সেই আলাপের লিখিতরূপ নিচে তুলে ধরা হল। —তাসনীম মাহমুদ   

Advertisement

আসসালামু আলাইকুম।
ওয়ালাইকুম আসসালাম।

কেমন আছেন?
আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

নয়া দিগন্ত পত্রিকা শুরুর সময়ে আপনার দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাই। 
পত্রিকাটির ডামি সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার সময় আরামবাগের ইডেন কমপ্লেক্সে অফিস ছিল। আমি তখন প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে পত্রিকাটিতে যোগদান করি। এর আগে দৈনিক ইনকিলাবে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে ছিলাম। তার আগে দিনকালে বিশেষ সংবাদতা হিসেবে কাজ করেছি। এখানে দায়িত্ব গ্রহণ করে রিপোর্টিং টিমকে সংগঠিত করাই ছিল আমার মূল দায়িত্ব। পত্রিকা সংগঠিত করার দায়িত্বে ছিলেন সে সময়ের নির্বাহী সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিন পর, মানে ডামি সংখ্যা বের করার ঠিক আগে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন— প্রবীণ সাংবাদিক আলমগীর মহিউদ্দিন। বাংলাদেশ টাইমস, নিউনেশন এমন সব পত্রিকা দীর্ঘ সময় ধরে সম্পাদনা করতেন তিনি। 

ইডেন কমপ্লেক্সে অফিস থাকাকালীন পত্রিকাটির অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়, সেই সময়ের অনুভূতি সম্পর্কে বলবেন। 
এটি খুব কঠিন একটা সময়। আমরা তখন অফিসে ছিলাম। কিছু দুর্বৃত্ত যারা আসলে এক ধরনের ফ্যাসিবাদ কায়েম করার রেজিম শুরু করেছিল। তখন ওই ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে দেশব্যাপী আন্দোলন তৈরি হওয়ায় তারা মনে করেছিল যে—গণমাধ্যমের উপরে যদি একটা চাপ তৈরি করা যায় তাহলে হয়তো তাদের যে ষড়যন্ত্র সেটি সফল হবে। তার অংশ হিসেবে তখন তারা নয়া দিগন্তের ইডেন কমপ্লেক্সের নিজস্ব ভবনের অফিস, প্রেস, পত্রিকা ছাপানোর কাগজ রাখার গুদামে আগুন দেয়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে—নয়া দিগন্তের প্রতিটি কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব দুর্বৃত্তদের প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। নির্বাহী সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর’র নেতৃত্বে আমরা সবাই নিচে নেমে আসি এবং আমাদের সমৃদ্ধ প্রতিরোধের মুখে আক্রমণকারীরা শেষমেষ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। 

ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ ১৭ বছর নির্যাতন করেছে এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের টুটি চেপে ধরার চেষ্টা করে। ঠিক ওই সময়ে পত্রিকাটি কিভাবে কাজ করেছে?
আমরা তখন অনেক ধরনের বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে পড়ি। একটি দৈনিক পত্রিকা টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন হচ্ছে বিজ্ঞাপনের রাজস্ব। সরকারি বিজ্ঞাপনের রাজস্বকে একেবারেই শূন্যে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে নয়া দিগন্তের সংবাদকর্মীদের বেতন-ভাতা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এই অনিয়মিত বেতন-ভাতা নিয়েও তারা তাদের বৃহত্তর স্বার্থে কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন, কার্যক্রম চালিয়ে যান। তখন পরিস্থিতি এমন কঠিন হয়ে পড়ে যে—অভাবের কারণে অনেকে তাদের পরিবার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হন। 

যতদিন পর্যন্ত মীর কাসেম আলী এটির নেতৃত্বে ছিলেন ততদিন পর্যন্ত সঙ্কট হয়নি। কারণ উনার একটা গতিশীলতা ছিল। কিন্তু উনাকে যখন অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তখন সত্যিকার অর্থে পত্রিকাটি বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে পড়ে যায়। এরপর নয়া দিগন্ত বিশেষ করে ২০১৯ সালে করোনাকালীন সময়ে পত্রিকার আকার ছোট করে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। ১৬ পৃষ্ঠা থেকে আমরা এটিকে আট পৃষ্ঠায় নিয়ে আসি। এরপরও নয়া দিগন্তের কর্মীরা এই পত্রিকাটিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য অপরিসীম কষ্ট স্বীকার করেছেন। 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হয়। ওই সময়ে পত্রিকাটির ভূমিকা কেমন ছিল?
আসলে ২৪শের যে গণঅভ্যুত্থান ওই অভ্যুত্থানের ঘটনাটা হয়তো এক মাসের বা ৩৬ দিনের একটি ফলাফল কিন্তু গণঅভ্যুত্থানটি একদিনে তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হওয়ার জন্য ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সংগ্রাম—সেটি রাজপথের প্রতিরোধ, ছাত্র অঙ্গনের প্রতিরোধ, রাজনৈতিক পক্ষ, শ্রমিক পক্ষগুলোর প্রতিরোধ, পাশাপাশি গণমাধ্যম কর্মীদের অপরিসীম প্রচেষ্টার ফসল ছিল। ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী যে সরকার ছিল একটা পর্যায়ে সে সরকার সব গণমাধ্যমগুলো এক এক করে বন্ধ করে দেয়। যেমন : আপনারা জানেন—সিএসবি টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া হয়। এর বাইরে আমার দেশ পত্রিকাসহ আরো অনেক পত্রিকা ও গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়। সবশেষে দৈনিক নয়া দিগন্তকেও নোটিশ দেয়া হয়েছিল কোনো একটি নিউজের ব্যাপারে। তিন দিনের মধ্যে জবাব দেয়ার জন্য নোটিশটি দেয়া হয় এবং সেটির ভাষা এমন ছিল যে, হয়তো চতুর্থ দিনের দিন নয়া দিগন্ত গুটিয়ে ফেলা হবে। 

সৌভাগ্যক্রমে বাংলাদেশের কিছু কূটনৈতিক অংশীদারদের চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত পত্রিকাটি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে আয়ের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল তারা। দৈনিক নয়া দিগন্ত সার্কুলেশনের দিক থেকে যেখানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় নম্বরের পত্রিকা ছিল সেখানে ডিএপির ক্রমিক নিয়ে যাওয়া হয় ৪০-৫০-এর উপরে। এগুলো হলো—সরাসরি বন্ধ না করে বন্ধ হতে বাধ্য করার মতো একটা ব্যাপার। যেমন : অনেক সময় দেখা যায়, অনাহার একজন ব্যক্তিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। বিষয়টি অনেকটা ওই রকমই।

গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর পত্রিকাটির বর্তমান অবস্থা কেমন?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সত্যিকার অর্থে পত্রিকাটির যে প্রাপ্য সম্মান-মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক অধিকার বিজ্ঞাপন, সেটি তার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে শুরু করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে দেড় বছর ওই সময়ে আমরা আবার আমাদের পূর্বের অবস্থান ফিরে পাই। নয়া দিগন্তের মধ্যে একটা প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে আসে এবং সকল কর্মী আবার পুরোদমে কাজ শুরু করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারের সময় নয়া দিগন্তের প্রাপ্য অংশীদারিত্ব থেকে পুনরায় বঞ্চিত হচ্ছি। বলা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সরকারি বিজ্ঞাপনের আয় যে পর্যায়ে ছিল এখন তার এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এটি নয়া দিগন্তের কর্মীদের জন্য অশনি সঙ্কেত হিসেবে দেখা যাচ্ছে। 

যদিও আমরা ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে রাজনৈতিক দল যারা ছিল, যারা এখন সরকারে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের পাশে ছিলাম। তাদের দুঃখ-দুর্দশাকে আমরা ধারণ করেছিলাম। আমাদের দুঃখ-দুর্দশার সময়ও কিন্তু তারা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষ করে আমার মনে পড়ে, যখন ২০১৩ সালে নয়া দিগন্ত ভবনে আগুন দেয়া হয় তখন বিএনপির নেতারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। 

দু’জনের নাম আমরা বিশেষভাবে বলতে চাই— যেমন : বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও নজরুল ইসলাম খান। উনারা দু’জনই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন এখনকার সম্মানিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়াও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অবিসংবাদিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বার্তা দিয়েছিলেন আমাদের পাশে থাকার এবং উনি সম্ভব্য সবটুকু সহযোগিতা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। 

নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে পত্রিকাটির সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই।
আমরা দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের সম্ভাবনার সাথে মিলিয়ে দেখতে চাই। এই পত্রিকাটি যখন যাত্রা শুরু করে তখন আমাদের স্বপ্ন পুরুষ মীর কাসেম আলী বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার অতন্ত্র প্রহরী হবে নয়া দিগন্ত। স্বাধীনতার বিপক্ষে যায় এমন কোনো কিছু আমরা প্রমোট করব না। দেশের ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং নৈতিকভিত্তির বিপক্ষে কিছু করব না।’

দীর্ঘ ২২ বছর ধরে আমরা এই বিষয়টিকে লালন করে আসছি। এটিকে কার্যকর করে আসছি। আমরা বিশ্বাস করি—বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অখণ্ডতা নির্ভর করে এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে জনগণের যে সম্মিলিত চেতনা—ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ তার ওপর ভিত্তি করে। একই সাথে আমরা মনে করি যে, দৈনিক নয়া দিগন্ত আরো অনেক বিকশিত হবে অনেক অগ্রসর হতে পারবে। যেদিন আমরা থাকবো না, সেদিনও এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে নয়া দিগন্ত টিকে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

পত্রিকাটির ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঠক, দর্শক, শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আপনার শুভেচ্ছা বার্তা জানাবেন।
নয়া দিগন্ত সবসময় বাংলাদেশের জনগণের পাশে আছে। জনগণও নয়া দিগন্তের পাশে থাকবে প্রত্যাশা করি। বিশেষভাবে নয়া দিগন্তকে যারা বিজ্ঞাপন দিয়ে সহযোগিতা করেন, যারা নয়া দিগন্তের বিপণনে সহযোগিতা করে আসছেন, আমাদের হকার-ভাই-বন্ধুরা তাদের সবাইকে আমরা এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাই। এবং তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, তারা যেন নয়া দিগন্তের অগ্রযাত্রায় আগে যেভাবে শরীক হয়েছিলেন ভবিষ্যতেও একইভাবে শরিক থাকবেন। 

নয়া দিগন্তের অনলাইন বিভাগকে মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ
আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনারাও আমাদের এই অগ্রযাত্রার শরীক এবং সামনেও একই সাথে আমরা অগ্রসর হতে চাই। লক্ষ্য আছে, সে লক্ষ্য অর্জনে সবাই একসাথে এগিয়ে যেতে চাই।