তেহরান. ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, শীর্ষ কর্মকর্তা,
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন ((বাম থেকে ডানে)। দ্য ডন

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তারা সোমবার ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠকে বসছেন। পশ্চিম এশিয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হবে বৈঠকে। ইরানের প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর কথা রয়েছে।

Advertisement

ইরানের ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি ও পাকিস্তানের পুরোনো ইংরেজি দৈনিক ডন সোমবার (২৬ অক্টোবর) এ খবর জানায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা ও ইসনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন বৈঠকে অংশ নেবেন।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপসচিব আলি বাকেরি কানি জানান, সফররত কর্মকর্তারা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ির সাথে যৌথ বৈঠক করবেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই জানিয়েছেন, আলোচনায় অঞ্চলটির জন্য সবচেয়ে জরুরি হুমকিগুলো গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী নীতি, ফিলিস্তিন ও লেবাননের পরিস্থিতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসনের আঞ্চলিক প্রভাব।

সৌদি আরবের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ির সাথেও বৈঠক করবেন।

ক্রিমলির ভাষায়, চলমান সংকটে জড়িত পক্ষগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো, সংলাপ এগিয়ে নেয়া এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে এ সফর করা হচ্ছে। এ উদ্যোগে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকেও সমর্থন দেয়া হবে।

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের সদস্য। আগস্টে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সৌদি আরব সংঘাতে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ার পর ইরান ও জোটের তিন সদস্যের মধ্যে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের যৌথ যোগাযোগ হতে যাচ্ছে।

গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেন। তখন ইরানের নেতারা জানান, দুই দেশের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে। তেহরানের সাত দফা প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে নতুন করে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হতে পারে বলেও তারা জানান। মুনিরের সফরেই চার দেশের এই বৈঠকের প্রস্তাব ওঠে। ইরান তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করেছে বলে বাকেই জানিয়েছেন। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

বাকেরি কানি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ৪০ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার এই উদ্যোগ এসেছে। তাঁর মতে, নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি সফল মডেল। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ এবং ইসরাইলের ভূমিকা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। চার দেশের বৈঠক একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

যুদ্ধের প্রভাব ও বাড়তে থাকা উত্তেজনা

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে আকস্মিক হামলা চালায়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পাল্টা হামলা চালিয়ে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানে। ৪০ দিনের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরে জুনের মাঝামাঝি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে স্থায়ী সমাধানের পথ নির্ধারণে জুনে হওয়া একটি চুক্তি ভেঙে পড়ার পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে আছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালী দিয়ে চলাচল করত। ইরান বলছে, প্রণালীটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই। তেহরানের অনুমতি ছাড়া পারাপার হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজকে তারা নিয়মিত নিশানা করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে।

ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হাউছিদের মধ্যে লড়াইও এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হাউছিদের হামলা বেড়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আরো কঠোর হয়েছে। এসব পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাকেই রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় একতরফা দাবি জানালেও ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তবে কূটনীতির দরজাও খোলা রাখছে তেহরান।