
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন ঘটনার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। সংস্থাটির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কিছু কর্মকর্তার ওপর পড়তে শুরু করলেও আদালতের কাজ ব্যাহত হয়নি। তদন্তের সক্ষমতা বা কাজের পরিধি কমানোর কোনো সিদ্ধান্তও নেয়া হয়নি।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান শনিবার (২৪ অক্টোবর) জানায়, চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আইসিসির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। ট্রাম্প প্রশাসনের নিয়মিত সমালোচনার শিকার আদালতটিকে তিনি ‘বেপরোয়া আদালত’ বলে আখ্যা দেন। রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আইসিসি হয় তাদের হুমকি দেয়া বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসিকেই বন্ধ করে দেব।’
নতুন প্রধান কৌঁসুলি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত দফতরের দায়িত্ব যৌথভাবে সামলাচ্ছেন নাজহাত শামীম খান। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হতে ছয় মাস সময় থাকলেও কিছু কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ব্যাংকিং সমস্যায় পড়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পরিধি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর গাজা যুদ্ধের তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান খান। তবে আদালতের নির্দেশে নতুন অভিযোগ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন প্রকাশ করা যাচ্ছে না। বিচারকেরা অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত এসব আবেদন গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
খান বলেন, বাইরে থেকে মনে হতে পারে তদন্তে কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু গাজা যুদ্ধসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সব ক্ষেত্রেই তদন্ত চলছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের সক্ষমতা বা কাজের পরিমাণ কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত আমরা নিইনি।’
নিষেধাজ্ঞা সামলাতে বিকল্প প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে আইসিসি নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনছে। মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের বদলে ইউরোপীয় বিকল্প ব্যবহার শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার সেবা চালু রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেও আলোচনা চলছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আইসিসির ১৩ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। নাজহাত শামীম খান তাঁদের একজন। নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং ও বিমার মতো দৈনন্দিন কাজেও অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ড ছাড়া জীবনযাপন বেশ অসুবিধার। এখন বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ভ্রমণের ক্ষেত্রে, ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অনেক কিছুই করা যায় না, তা বিস্ময়কর।’
তবে শরণার্থী শিবির কিংবা ব্যাপক নৃশংসতার ঘটনাস্থলে গেলে নিজের অসুবিধাকে তুচ্ছ মনে হয় তাঁর। খান বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগীদের মুখ দেখি। নিষেধাজ্ঞা বা ক্রেডিট কার্ড তাঁদের কাছে কোনো বিষয় নয়। তাঁরা শুধু বিচার চান।’
আফগানিস্তানের তদন্ত
আইসিসির কাজের ওপর চাপের আরেকটি দিক হলো, আদালতের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত। ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। ব্রিটিশ আইনজীবী করিম খান অভিযোগ অস্বীকার করেন। চলতি বছরের জুলাইয়ে সদস্যদেশগুলোর ভোটে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তাঁর সাথে উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খানের কোনো আত্মীয়তা নেই।
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় রুবিও বলেছিলেন, মার্কিন উদ্বেগের সমাধান নিয়ে আলোচনা ও প্রস্তাব দেয়ার জন্য আইসিসিকে ছয় মাস সময় দেয়া হচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের বিরোধিতার পরও কোন পদক্ষেপে তাদের উদ্বেগ দূর হবে, তা স্পষ্ট নয়।
রুবিওর দাবি, বিশ্বায়নপন্থী বিশেষজ্ঞরা মার্কিন নাগরিকদের আইসিসিতে বিচারের মুখোমুখি করতে চান। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। জবাবে নাজহাত শামীম খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।
আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেখানে তদন্তের অগ্রাধিকারে রয়েছে তালেবান ও ইসলামিক স্টেট খোরাসানের হাতে নারী, কিশোরী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ। চলতি মাসের শুরুতে আইসিসির প্রাক-বিচারিক আদালত তালেবানের সদস্যদের বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগে চারটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
এদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঠেকানো কিংবা আদালতকে অন্যভাবে সুরক্ষা দেয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আলোচনা চলছে। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আইসিসি ও এর কর্মকর্তাদের চিন্তার স্বাধীনতার জন্য দেয়া সাখারভ পুরস্কারে ভূষিত করে। বিভিন্ন দেশও আদালতের ব্যয় মেটাতে নিয়মিত অর্থ দেয়ার অঙ্গীকার করেছে।
খানের মতে, আদালতকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মনোযোগই প্রমাণ করে, এর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ‘যেসব ভুক্তভোগীর যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই, যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিচার চান এবং নিজেদের কথা শোনাতে চান, এই আদালত তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি পথ করে দেয়।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








