আগামী ৯ নভেম্বর কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলন শুরু হবে
আগামী ৯ নভেম্বর কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলন শুরু হবে । সংগৃহীত ছবি

রেকর্ড মাত্রায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি ও পৃথিবী উষ্ণ করে এমন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসার বাড়তি চাপের মধ্যে আগামী ৯ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় শুরু হচ্ছে কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলন।

Advertisement

এবারের দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষির আয়োজন করছে তুরস্ক। তবে সম্মেলনের কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দেবে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনের জন্য দুই দেশই প্রার্থী হওয়ার পর নজিরবিহীন এক সমঝোতার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বড় কোনো নতুন বিষয় তুলনামূলকভাবে কম থাকছে। এর পরিবর্তে স্বেচ্ছাভিত্তিক জলবায়ু উদ্যোগগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। আয়োজক দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি উপায় হিসেবে ‘বিদ্যুতায়নের’ ওপর জোর দিচ্ছে।

তবে চলতি বছরে ভয়াবহ জলবায়ু দুর্যোগ ও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও তুরস্কের সমুদ্র তীরবর্তী শহর আনতালিয়ায় সম্মেলনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনায় বড় প্রভাব ফেলবে।

জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে অচলাবস্থা
জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধে সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক লক্ষ্য বা পথনকশা নির্ধারণের চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই আটকে আছে। বরাবরের মতো জটিল এই বিষয়টি কপ-৩১-এর আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচির অংশও নয়।

এ বিষয়ে বৈশ্বিক ঐকমত্য না থাকায় ব্রাজিল এবার একটি স্বেচ্ছাভিত্তিক ‘রোডম্যাপ’ বা পথনকশা প্রকাশ করতে পারে।

গত বছরের কপ সম্মেলনে কয়লা, তেল ও গ্যাস থেকে সরে আসার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশগুলো কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।

তবে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা আনতালিয়ায় আবারো উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। চলতি বছর জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার দ্রুত কমানোর দাবি জানানো প্রায় ৬০টি দেশ জাতিসঙ্ঘের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বাইরে নিজেদের একটি সম্মেলন করেছে।

কপ-৩১-এ এসব দেশকে কিভাবে সম্পৃক্ত করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, তারা সম্মেলনের আলোচনায় পূর্বানুমানযোগ্যতা বজায় রাখতে চায় এবং শেষ মুহূর্তে কোনো চমক দিতে চায় না।

বিদ্যুতায়নে জোর
তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া বরং ‘বিদ্যুতায়নের’ ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে চায়। এর অর্থ হলো ডিজেলচালিত গাড়ি বা গ্যাসে ঘর গরম করার মতো সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো প্রযুক্তির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বিকল্প ব্যবহার করা।

আনতালিয়ায় আয়োজকদের প্রধান উদ্যোগগুলোর একটি হলো, দেশগুলোকে একটি স্বেচ্ছাভিত্তিক লক্ষ্যে সম্মত করা। এর আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের অংশ বর্তমানের প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে নেয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

আয়োজক দেশগুলোর দাবি, বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ালে তাপ আটকে রাখা গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমতে পারে এবং ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কার পর অনেক দেশের কাছেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে বিশ্বের মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখনো কয়লা থেকে উৎপাদিত হয়। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিভাবে উৎপাদন করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় এই উদ্যোগের বাস্তবতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বেচ্ছাভিত্তিক জলবায়ু উদ্যোগ
বিদ্যুতায়নের মূল উদ্যোগের পাশাপাশি তুরস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মিথেন নিঃসরণ, বর্জ্য কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল শহর গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু স্বেচ্ছাভিত্তিক উদ্যোগ নিচ্ছে।

এসব বাধ্যতামূলক নয় এমন অঙ্গীকার আনুষ্ঠানিক কপ আলোচনার পাশাপাশি পৃথক একটি ‘অ্যাকশন অ্যাজেন্ডা’-তে থাকবে।

আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সিদ্ধান্ত নিতে সব দেশের ঐকমত্য প্রয়োজন এবং চূড়ান্ত নথির প্রতিটি বাক্য নিয়েও দেশগুলোকে একমত হতে হয়।

এবারের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বড় কোনো শিরোনাম তৈরি করার মতো বিষয় তুলনামূলক কম। বেশিভাগ আলোচনাই আগের সম্মেলনগুলো থেকে চলে আসা কারিগরি বিষয় নিয়ে হবে।

জলবায়ু মোকাবেলায় অর্থ
কপ সম্মেলনগুলোর অন্যতম পুরোনো বিরোধের বিষয় হলো—ধনী দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় দরিদ্র দেশগুলোকে কত অর্থ দেবে।

নেপালে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত ভয়াবহ বন্যার পর আনতালিয়ায় আবারো এই বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর আর্থিক সহায়তার আবেদন নতুন করে দীর্ঘদিনের দাবি সামনে এনেছে। দরিদ্র দেশগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং দুর্যোগের পর পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য ঐতিহাসিকভাবে বেশি দূষণকারী ধনী দেশগুলোর আরো অর্থ দেয়ার দাবি উঠেছে।

তুরস্ক নিজেকে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে তুলে ধরেছে। কপ-৩১-এর নতুন সভাপতি মুরাত কুরুম বলেছেন, জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘বিরাট ব্যবধান’ কমানো আনতালিয়া সম্মেলনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে।

সূত্র : বাসস