ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স
অ্যাম্বুলেন্স ধর্মঘটে সীমাহীন দুর্ভোগে রোগীরা। নয়া দিগন্ত

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পার্কিংয়ের দাবিতে দ্বিতীয় দিনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের আকস্মিক ধর্মঘটে এক মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। একদিকে স্বজন হারানোর তীব্র শোক, অন্যদিকে প্রিয়জনের লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আকুতি—সব মিলিয়ে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ এখন এক কান্নার রোল ও চরম অসহায়ত্বের চত্বরে পরিণত হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না কোনো অ্যাম্বুলেন্স। নিরুপায় হয়ে অনেকেই সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা পিকআপ ভ্যানে করে প্রিয়জনের লাশ নিয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। একইসাথে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে না পেরে চোখের সামনে ধুঁকতে দেখছেন অসহায় স্বজনরা।

Advertisement

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলের পর থেকেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মারা যান ফতুল্লা থেকে আসা ৬৫ বছর বয়সী হালিমা বেগম। মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা। কিন্তু মাওয়ায় তার লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও জোগাড় করতে পারেননি তার নাতি মোহাম্মদ শাহীন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহীন বলেন, ভাইরে কি বলবো সরকারি হাসপাতালে এসে এমন বিপদে পড়ব তা কোনোদিনও ভাবিনি। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কোনো দেখা নেই, বেসরকারিগুলোও বন্ধ। স্বজন হারানোর শোক ভুলে এখন লাশের পাশে বসে অপেক্ষা করছি। এই কষ্ট কাকে বোঝাব ভাই বলতে পারেন?

মুগদা হাসপাতাল থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ঢামেকে আনা হয়েছিল উন্নত চিকিৎসার জন্য। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ভাগ্নের এমন মৃত্যুতে স্তব্ধ মামা মোহাম্মদ হোসেন লাশের পাশে পাথরের মতো বসে ছিলেন। তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে কর্মচারীরা তাকে লাশ ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।  

হোসেন ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় সরকারি হাসপাতালে লাশ নেয়ার একটা গাড়ি পাব না, এটা কল্পনাও করিনি। আমরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়। বিকেল থেকে অসহায় হয়ে বসে আছি ভাই, কিভাবে ভাগ্নেকে বাড়ি নিয়ে যাবো।

শুধু লাশ নয়, এই ধর্মঘটের নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছেন রোগীরাও। যশোর থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শাশুড়িকে নিয়ে ঢামেকে এসেছিলেন আব্দুল্লাহ। চিকিৎসকরা তাকে জরুরি ভিত্তিতে কিডনি হাসপাতালে রেফার করলেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাননি তিনি। 

আব্দুল্লাহ জানান, সময়মতো আমাদের রোগীকে অন্য হাসপাতালে নিতে না পারলে যেকোনো মুহূর্তে অবস্থা আরো আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে। অথচ কী আশ্চর্য কেউ কোনো সমাধান দিতে পারছে না। তিনি কাকুতি মিনতি করে বলেন, আমরা কি করবো ভাই এখন, আপনারাই আমাদের একটা ব্যবস্থা করে দেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসা আরেক ভুক্তভোগী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, ১৯ দিন ধরে আমাদের রোগী (আইসিইউ) ভর্তি ছিলো। সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান করতে থাকি। কিন্তু কোনোভাবেই অ্যাম্বুলেন্স পাচ্ছিলাম না। ৯৯৯ কল দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছিলো না। সাড়ে ১১টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান পাই। সেটা নিয়েও আমাদের সাথে নাটক হয়। বিভিন্ন রকম প্যাঁচের মধ্যে আমরা পড়ছিলাম। যেখানে ৮ হাজার টাকা লাগে সেখানে ১২ হাজার টাকা চাইছে আমাদের কাছে। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টা আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক।  এভাবে যদি চলতে থাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোন দিকে যাবে এটা নিয়েই চিন্তা। 

মঙ্গলবার বিকেল থেকে বুধবার পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল সরজমিনে ঘুরে এই সমস্যাগুলো উঠে আসে।

নেপথ্যে পার্কিংয়ের বিরোধ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেনের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগ করে জানান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মো: ফরহাদ হোসেন দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের সব অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে নতুন ভবনের নিচে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে তাদের দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কারও করানো হয় এবং সেখানে সিসি ক্যামেরা ও লাইট স্থাপন করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেখান থেকেও গাড়ি সরিয়ে দেয়া হয়।

তিনি আরো বলেন, রাস্তায় গাড়ি রাখলে পুলিশ মামলা দেয়, আর হাসপাতালের ভেতরেও আমাদের জায়গা দেয়া হচ্ছে না। সিসি ক্যামেরা ও গেট স্থাপনে আমাদের কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমরা প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দিতেও রাজি আছি। কিন্তু ভাই একটা কথা—আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের ধর্মঘট চলবে।

এদিকে হাসপাতালের ভেতর থেকে কাঙ্ক্ষিত অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে অনেকেই বাইরের অ্যাম্বুলেন্সের খোঁজ করছেন, কিন্তু ধর্মঘটের কারণে সেগুলোও হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে পারছে না। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী ও রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করে জানান, এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি নিরসনে হাসপাতালের পরিচালকের উচিত অবিলম্বে অ্যাম্বুলেন্স নেতাদের সাথে আলোচনায় বসে একটি মানবিক সমাধান খোঁজা।

এই চরম অব্যবস্থাপনা ও মানবিক সঙ্কটের বিষয়ে জানতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যাবে। রোগীদের সাময়িক কষ্টের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর মহলের সাথে কথা হয়েছে, আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জন্য আরো কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স দেবে, যাতে করে রোগীরা সেবা পান।

শোকাতুর মানুষের কান্না আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠা ঢাকা মেডিক্যাল প্রাঙ্গণে এখন একটাই প্রশ্ন—আর কতক্ষণ লাশের পাশে বসে এভাবে অপেক্ষা করতে হবে স্বজনদের?