বিশ্ব হার্ট দিবসে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে সেমিনার 
বিশ্ব হার্ট দিবসে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে সেমিনার । নয়া দিগন্ত

 

Advertisement

 

‘প্রতিটি হৃদ্‌স্পন্দনই জীবন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বিশ্ব হার্ট দিবস পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ, ঝুঁকি কমানো, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী। প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: নাজমুল হোসেন।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর দুই কোটি পাঁচ লাখের বেশি মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যান। অথচ বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব রোগের প্রায় ৮০ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য। তাই হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে চিকিৎসার পাশাপাশি ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন গবেষণা, জনসচেতনতা ও অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে সারাবছর হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে কাজ করছে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা: সোহেল রেজা চৌধুরী। তিনি বলেন, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর নির্ভর করে না; এজন্য কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে তিনি তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলো হলো—তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৬-এর বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন; প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ; এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী লবণ গ্রহণ সীমিত করা। তার মতে, এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: নাজমুল হোসেন বলেন, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে শুরু থেকেই ঝুঁকির বিষয়গুলো চিহ্নিত করা জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও তামাক ব্যবহারের মতো ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদ্‌রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তামাকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ই-সিগারেটসহ নতুন ধরনের নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা মানুষের কাছে আরো সহজলভ্য করতে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায় থেকে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে সরকার চিকিৎসক নিয়োগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যাতে স্বাস্থ্যসেবা আরো সহজে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া যায়।

অধ্যাপক ডা: খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভর করলে হবে না; রোগের ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। তামাক ব্যবহার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদ্‌রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। এসব ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে সরকার, চিকিৎসক, গবেষক, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন গবেষণা, চিকিৎসাসেবা ও জনসচেতনতার পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে নীতিগত উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাবে।

বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিনা মূল্যে হৃদ্‌রোগ নির্ণয় ক্যাম্প, সচেতনতামূলক পোস্টার ও লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। রাজধানীর বাইরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ৪৫টি অ্যাফিলিয়েটেড বডিও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে।

এর আগে, ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এতে কয়েক শতাধিক মানুষ অংশ নেন।