হ্যারি কেইন, ইংল্যান্ড, টটেনহাম, বিশ্বকাপ, গোল্ডেন বুট, ব্যালন ডি’অর
ব্যালন ডি’অর জয়ী হ্যারি কেইন। সংগৃহীত

গোল করেছেন অগণিত, রেকর্ড ভেঙেছেন একের পর এক। ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতার পাশাপাশি হয়েছেন টটেনহামের ইতিহাসের সেরা গোলদাতা, জিতেছেন গোল্ডেন বুটও। তবু ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত পুরস্কারটি যেন বারবারই দূরে সরে গেছে।

Advertisement

৩৩ বছরে এসে অবশেষে সেই অপূর্ণতাও ঘুচল হ্যারি কেইনের। লন্ডনের প্যালাডিয়ামে সোমবার রাতে লামিন ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

কেইনের এই জয় আসলে একটি দীর্ঘ পথের স্বীকৃতি। এমন এক পথ, যেখানে গোলের সাথে পাল্লা দিয়ে এসেছে অপেক্ষাও। ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে নিয়ে খুব বেশি উচ্চাশা ছিল না। নিজেই বলেছেন, একদিন সুপারস্টার হয়ে উঠবেন—এমন মানুষ তিনি কখনো ছিলেন না।

সময় লেগেছে, কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে, এমনকি অনেক সময় নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাটাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই কেইনই শেষ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় তুললেন।

কেইনের হাতে এবারের পুরস্কার ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তার অবিশ্বাস্য গোলের পরিসংখ্যান। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেছেন তিনি, সাথে ছিল ৮টি অ্যাসিস্ট।

এর মাঝে বায়ার্নের হয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল, ইংল্যান্ডের হয়ে গোল ছিল ১২টি। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার সুপারকাপ জিতেছে বায়ার্ন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ৬ গোল করে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।

২০২৩ সালে টটেনহাম ছেড়ে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর আগেও কেইনের ব্যক্তিগত অর্জনের অভাব ছিল না। কিন্তু বড় দলীয় শিরোপা ছিল অধরা। বায়ার্নে এসে সেই আক্ষেপও ঘুচেছে। এবার দলীয় সাফল্যের সাথে যোগ হলো ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি। 

এর আগে টটেনহামের জার্সিতেও ৪৩৫ ম্যাচে ২৮০ গোল করে ক্লাবটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। পেছনে ফেলেছেন কিংবদন্তি জিমি গ্রিভসকে। প্রিমিয়ার লিগে তিনবার জিতেছেন গোল্ডেন বুট। ২০১৮ বিশ্বকাপেও ছয় গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট।

ইংল্যান্ডের জার্সিতেও তার কীর্তি অনন্য। ২০২৩ সালে ওয়েন রুনিকে পেছনে ফেলে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন কেইন। এখন জাতীয় দলের হয়ে ১২৫ ম্যাচে তার গোল ৯১টি। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বকাপের মূল পর্বে ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪ গোলও তার।

অর্থাৎ ব্যালন ডি’অর যখন এলো, তখন কেইনের পরিচয় নতুন করে বলার মতো কিছুই বাকি ছিল না। রেকর্ড ছিল, গোল ছিল, নেতৃত্ব ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল। শুধু ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সেই স্বীকৃতিটাই ছিল অধরা।

সেই অপেক্ষার শেষটাও হলো নিজের শহরে। লন্ডনের প্যালাডিয়ামে যখন দুইবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী ব্রাজিলিয়ান রোনালদোর হাত থেকে পুরস্কার নিলেন কেইন, তখন তার সামনে ছিল শুধু একটি ট্রফি নয়—ছিল ২৫ বছরের ইংলিশ অপেক্ষারও অবসান।

মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতলেন তিনি। সব মিলিয়ে ইংল্যান্ডের পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে উঠলেন এই মুকুটের মালিকদের তালিকায়।

ইয়ামাল-এমবাপ্পেদের প্রজন্মের তারকাদের ভিড়ে তাই শেষ হাসিটা হাসলেন অভিজ্ঞ কেইন। ৩৩ বছর বয়সে এসে প্রমাণ করলেন, সব গল্পের নায়ক শুরু থেকেই হতে হয় না—কখনো কখনো সবচেয়ে বড় মুকুটটির জন্য অপেক্ষা করতেই হয় দীর্ঘদিন।

পুরস্কার হাতে নিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কেইন। লন্ডনে এই পুরস্কার পাওয়া তার কাছে বিশেষ কিছু বলে জানান তিনি। যারা তাকে ভোট দিয়েছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এবারের পুরস্কারের লড়াই কঠিন ছিল বলেও মনে করেন তিনি।

নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে কেইন বলেন, ‘অনেকেই এটা ভাবেননি। এমনকি আমিও ভাবিনি যে এতটা পথ আসতে পারব। অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে।’

এরপর নিজের মানসিক লড়াইয়ের কথাও তুলে ধরেন তিনি বলেন, ‘সময় লেগেছে। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক সময় নিজেই নিজের বিপক্ষে চলে গিয়েও বিশ্বাসটা ধরে রাখতে হয়েছে।’ 

এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে মনোনয়ন পাওয়া সব খেলোয়াড় ও বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান তিনি।