
ম্যাচের আগের দিন জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে হঠাৎ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের ডেনমার্ক সফরের মাঝপথে তার চলে যাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা গুঞ্জন। এবার মঙ্গলবার দীর্ঘ বিবৃতিতে সেই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন পর্তুগাল অধিনায়ক।
তার অভিযোগ, কোচ জর্জে জেসুস দুই দফায় তার সাথে করা কথা রাখেননি। প্রথমবার নরওয়ের বিপক্ষে ৩০ মিনিট খেলার কথা বলেও তাকে মাঠে নামানো হয়নি। পরে ব্যক্তিগত আলোচনায় যা ঠিক হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনে তার সাথে মিল রেখে কথা বলেননি কোচ।
রোনালদোর দাবি, ২০২৬ বিশ্বকাপের পরই জাতীয় দল থেকে বিদায় নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি পর্তুগালের মানুষের উদ্দেশে বিদায়ী একটি চিঠিও লিখেছিলেন। তবে বিশ্বকাপ শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসা তাকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন।
ফেডারেশন তাকে আরো কিছুদিন জাতীয় দলে চেয়েছিল। এরপর প্রোয়েনসা নতুন কোচ হিসেবে জেসুসকে নিয়োগের ব্যাপারেও রোনালদোর মতামত জানতে চান। রোনালদো জানান, তার মতে জেসুসই সঠিক পছন্দ। এর কয়েক দিন পর জেসুস নিজেই রোনালদোর সাথে দেখা করেন।
রোনালদোর ভাষ্য, সেই আলোচনায় কোচ জানান, তার ওপর আস্থা আছে ও দলের পরিকল্পনায় তার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। নেশনস লিগের প্রথম ধাপের চার ম্যাচের জন্য একটি পরিকল্পনাও দেয়া হয় তাকে। সেখানে প্রথম ও শেষ ম্যাচে খেলার কথা ছিল রোনালদোর। শারীরিক চাপ কমাতে নরওয়ে ও ডেনমার্কের অ্যাওয়ে ম্যাচে দলের সাথে না গিয়ে পর্তুগালে থাকার প্রস্তাবও দেন জেসুস।
কিন্তু সেই প্রস্তাব সাথে সাথেই প্রত্যাখ্যান করেন রোনালদো। তার যুক্তি ছিল, তিনি দলের অধিনায়ক; অ্যাওয়ে ম্যাচে না খেললেও দলের সাথে সফরে থাকা উচিত তার। পরে কোচ তার অবস্থান মেনে নেন বলে দাবি করেন রোনালদো।
ওয়েলসের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলেন রোনালদো। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে তাকে বেঞ্চে রাখা হয়। এতে আপত্তি ছিল না তার। কিন্তু ম্যাচের দিন মধ্যাহ্নভোজের সময় একজন সহকারী কোচ এসে জানান, জেসুস তার সাথে কথা বলতে চান।
রোনালদোর দাবি, কোচ তখন জানতে চান তিনি ৩০ মিনিট খেলার মতো ফিট কিনা। তিনি রাজি হয়ে যান ও তাকে ৩০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ওয়ার্ম-আপ করেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি রোনালদো। সেখানেই প্রথমবার কোচের কথা না রাখার অভিযোগ তোলেন তিনি।
রোনালদো বলেন, ‘এরপর যা হলো, তা তো ইতিহাস। বিরতির পর আমি ওয়ার্ম-আপ করলাম, মিনিটের পর মিনিট কেটে যেতে দেখলাম এবং তারা আমাকে ডাকল না। কোচ তার কথা রাখেননি।’
নরওয়ের বিপক্ষে ওই ম্যাচের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। রোনালদো ম্যাচ শেষে সমর্থকদের অভিবাদনের জবাব দিতে যাননি। পরে এ ঘটনাকে নিজের ভুল বলে স্বীকার করেন তিনি এবং সমর্থকদের কাছে ক্ষমাও চান।
শুধু তা-ই নয়, সতীর্থদের ছেড়ে ক্যাম্প থেকে চলে যাওয়ার বিষয়টিও ভুল ছিল বলে মেনে নেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। তার ভাষ্য, অধিনায়ক হিসেবে তার আচরণের পরিণতি হওয়া উচিত এবং ফেডারেশন তাকে যে শাস্তিই দিক, সেটি তিনি মেনে নেবেন।
এরপর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জেসুসের সাথে রোনালদোর সরাসরি আলোচনা হয়। সেখানে ছিলেন আল নাসরের ক্রীড়া পরিচালক সিমাও কৌতিনিয়ো। রোনালদোর দাবি, খুব খোলামেলা সেই আলোচনায় একটি সমঝোতা হয়েছিল।
জেসুস সংবাদ সম্মেলনে জানাবেন রোনালদো নিজে খেলার সময় দাবি করেননি, বরং চার ম্যাচের পরিকল্পনা কোচ নিজেই করেছিলেন। নরওয়ের বিপক্ষে রোনালদোকে ওয়ার্ম-আপ করিয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে না নামানোও ভুল ছিল—এ কথাও প্রকাশ্যে বলার কথা ছিল।
রোনালদোর দাবি, এ নিয়ে পরে একটি লিখিত নথিও তৈরি করা হয় এবং তিনি সেটি অনুমোদন করেন। কিন্তু জেসুসের পরের সংবাদ সম্মেলনে সেই সমঝোতার প্রতিফলন দেখেননি তিনি। বরং কোচের প্রকাশ্য বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল বলে অভিযোগ করেন রোনালদো। তার ভাষায়, এটিই ছিল কোচের সাথে তার দ্বিতীয়বার কথা না রাখার ঘটনা।
এরপরই ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন রোনালদো। তবে জেসুস পরে রোনালদোর বর্ণিত সেই সমঝোতা হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। ফলে পুরো ঘটনাটি এখন পর্যন্ত মূলত রোনালদোর বক্তব্য ও কোচের পাল্টা অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সবকিছুর পরও জাতীয় দলের দরজা নিজের জন্য বন্ধ করেননি রোনালদো। বরং জানিয়েছেন, শাস্তি থাকলে তা শেষ করার পর শারীরিকভাবে ফিট থাকলে এবং ক্লাবের হয়ে ভালো খেললে পর্তুগালের হয়ে আবারো খেলতে প্রস্তুত তিনি। অর্থাৎ, তার লক্ষ্য শুধু বিদায়ী ম্যাচ খেলা নয়; এখনো জাতীয় দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিততে চান তিনি।
রোনালদোর বক্তব্যে ক্যাম্প ছাড়ার ঘটনাটি তাই নিছক আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। কোচের সাথে আগে থেকে তৈরি হওয়া পরিকল্পনায় পরিবর্তন, নরওয়ে ম্যাচে ৩০ মিনিট খেলার কথা বলেও মাঠে না নামানো ও পরে ব্যক্তিগত আলোচনার সাথে প্রকাশ্য বক্তব্যের অমিল—সব মিলিয়েই জেসুসের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়েছেন পর্তুগালের অধিনায়ক।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








