লিওলেন মেসি, আর্জেন্টিনা, বিশ্বকাপ, অবসর
বিশ্বকাপে চুমু খাচ্ছেন লিওলেন মেসি। সংগৃহীত

একটা সময় এই আকাশী-সাদা জার্সিই ছিল মেসির সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার প্রতীক। ফাইনালের পর ফাইনাল হার, সমালোচনা, কান্না—এমনকি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।

Advertisement

অথচ সেই জার্সিতেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছেন, কোপা আমেরিকা জিতেছেন, আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেছেন। এবার সেই জার্সিতেই শেষবারের মতো মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ খেলবেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে এটি হবে তার ২০৮তম ম্যাচ। ২১ বছর আগে যে জার্সি গায়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই জার্সিতেই এবার নামতে যাচ্ছেন বিদায়ের মঞ্চে।

মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে ইতোমধ্যেই বিশেষ আয়োজন করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মনুমেন্টালে ম্যাচটির টিকিট বিক্রি শুরুর পর দ্রুতই শেষ হয়ে যায়।

সমর্থকদের কাছে এটি তাই শুধুই একটি প্রীতি ম্যাচ নয়; এটি তাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকাকে শেষবার মাঠে দেখার সুযোগ। শেষবার আকাশী-সাদা জার্সিতে মহানায়কের জাদুতে বুঁদ হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ।

২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। তখন বয়স মাত্র ১৮। সেই ম্যাচে অল্প সময়ের জন্য মাঠে নেমেছিলেন তিনি। এরপর দুই দশকের বেশি সময়ে জাতীয় দলের হয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়।

তবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা যতটা উজ্জ্বল ছিল, মাঝের পথটা ততটা সহজ ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার দিয়ে শুরু হয় বড় হতাশার অধ্যায়।

এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরপর দুই হার। দ্বিতীয়বারের পর হতাশা এতটাই তীব্র ছিল যে, টাইব্রেকারে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি।

সেটি অবশ্য স্থায়ী হয়নি। জাতীয় দলের হয়ে ফেরেন তিনি। আর সেই প্রত্যাবর্তনের পরই বদলে যেতে থাকে গল্প। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। মারাকানায় সেই জয়ের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা পান মেসি।

পরের বছর ইতালিকে হারিয়ে জেতেন ফিনালিসিমা। এরপর আসে কাতার বিশ্বকাপ। ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। 

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ম্যাচে মেসি করেন দুটি গোল। ১২০ মিনিটের নাটকীয় লড়াই শেষে টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে দলটি। আর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন মেসি।

এরপরও থামেনি তার আন্তর্জাতিক সাফল্য। ২০২৪ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির ট্রফির তালিকায় যোগ হয় আরেকটি বড় অর্জন।

তবে ২০২৬ বিশ্বকাপও তার ক্যারিয়ারে আলাদা অধ্যায় হয়ে থাকবে। ৩৯ বছর বয়সে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলেন তিনি। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ওঠেন ফাইনালে। কিন্তু এবার আর শিরোপা আসেনি। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা।

বিশ্বকাপের পরই আসে আনুষ্ঠানিক বিদায়ের ঘোষণা। ৩১ আগস্ট জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান মেসি। ফলে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ উপস্থিতি।

পরিসংখ্যানেও মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অনন্য। বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে তার গোল ১২৫টি। দেশের হয়ে ম্যাচ ও গোল—দুই ক্ষেত্রেই তিনি সর্বকালের সর্বোচ্চ।

বিশ্বকাপে ছয়বার অংশ নিয়ে ৩৪ ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন ২১ গোল। তবে মেসির আর্জেন্টিনা-গল্পকে শুধু এসব সংখ্যা দিয়ে বোঝানো কঠিন। দেশের জার্সিতে মহানায়ক হয়ে ওঠার পথটা মোটেও সহজ ছিল না তার।

এই জার্সিতেই তিনি হেরেছেন, কেঁদেছেন, অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। আবার এই জার্সিতেই ফিরেছেন, শিরোপা জিতেছেন, বিশ্বকাপ হাতে তুলেছেন। একসময় যে অপূর্ণতা তাকে তাড়িয়ে বেড়াত, শেষ পর্যন্ত সেই জার্সিই হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় সাফল্যের সাক্ষী।

সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষ দৃশ্য এবার মনুমেন্টালে। এবার তাই অপেক্ষা শুধু শেষ বাঁশির। মেসি হয়তো আরেকবার গ্যালারির দিকে তাকাবেন। হয়তো সতীর্থদের জড়িয়ে ধরবেন। আকাশী-সাদা জার্সিটা ছুঁয়ে দেখবেন শেষবারের মতো।

তারপর?  বি দা য়।