
‘অ-তে অজগর ওই আসছে তেড়ে’—বাংলা বর্ণপরিচয়ের এককালের এই পরিচিত ছড়া ইরানের বেলায় যেন দুঃস্বপ্নের মতো সত্য হয়ে উঠেছে। চলমান আলোচনা উপেক্ষা করে, জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। তার আগে থেকেই নানা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে দেশটিকে চেপে ধরার চেষ্টা করেছে ইসরাইলের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও তার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব। ইরানের সামনে তখন যেন সত্যিই ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’। চারদিকে ধ্বংসের আশঙ্কা, যুদ্ধের চাপ আর অর্থনৈতিক অবরোধ। এমন পরিস্থিতিতে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। অথই পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে যেমন কেউ বাঁচার পথ খোঁজে, তেমনি নিষেধাজ্ঞার ফাঁক গলে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের এক গোপন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে দেশটি।
রয়টার্সের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই নেটওয়ার্কের বিস্তৃত চিত্র। নথিপত্র, ব্যাংকের হিসাব, আমদানি-রপ্তানির তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে বার্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আড়ালে পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থার মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এর মধ্যে একটি সংস্থাই ২৩০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম এনেছে। এসব চালানে ছিল বিস্ফোরক, রকেটের জ্বালানি তৈরির উপকরণ, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও ভারী ট্রাক। যুদ্ধ চলার সময়ও স্থলপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথে সরবরাহ অব্যাহত ছিল।
ইরানের সামরিক বাহিনী হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করার পরও কীভাবে অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করছে, তা নিয়ে চলমান যুদ্ধের অন্যতম বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে রয়টার্স।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আড়ালে পাঁচ হাজার সংস্থা
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইংরেজি সংক্ষিপ্ত নাম এমওডি (এমওডি)। এই তিন অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া নামের আড়ালে রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থা। ফারসি ভাষায় এসব সংস্থার নামের শুরুতে ব্যবহৃত হয় ‘ভোদজা’।
ইরানের সামরিক বাহিনী হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করার পরও কীভাবে অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করছে, তা নিয়ে চলমান যুদ্ধের অন্যতম বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে রয়টার্স।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আড়ালে পাঁচ হাজার সংস্থা
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইংরেজি সংক্ষিপ্ত নাম এমওডি (এমওডি)। এই তিন অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া নামের আড়ালে রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থা। ফারসি ভাষায় এসব সংস্থার নামের শুরুতে ব্যবহৃত হয় ‘ভোদজা’।
নথিতে সংস্থাগুলোর নিবন্ধনের তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আয়াতুল্লাহ খামেনি নয়, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে রাজতন্ত্রের পতনের পর নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। তবে নথি অনুযায়ী, সংস্থাগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৩ সালে। সে সময় নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ও মুদ্রার মূল্য তীব্রভাবে কমে গিয়েছিল।
সংস্থাগুলোর নিবন্ধিত ঠিকানা একই—তেহরানে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর রসদ বিভাগের ঠিকানা। রয়টার্স ও ইসরাইলি-মার্কিন ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকস যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এই নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে।
এসব সংস্থা ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে লেনদেনের ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। বিদেশে থাকা মধ্যস্থতাকারী ও কাগুজে কোম্পানির মাধ্যমে তারা বিদেশে বিক্রি করা তেলের অর্থ দিয়ে সামরিক সরঞ্জাম কেনে। এসব লেনদেনে অর্থ সরাসরি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানির নথিতে অর্থ স্থানান্তর ছাড়াই লেনদেন নিষ্পত্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি তৈরিতে কাজ করা সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকি বলেন, ‘এই সংঘাতের সময় এবং তার বহু বছর আগে থেকেই এই নেটওয়ার্ক ইরানি শাসনব্যবস্থার সামরিক কার্যক্রম সচল রাখার প্রধান অবলম্বন।’
নথিতে দেখা গেছে, ৯১টি সংস্থার নামে নিবন্ধিত ফোন নম্বর ইরানের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক সেপাহর সেই হিসাবগুলোর নথিতেও রয়েছে, যেগুলো আইআরজিসির সদস্যদের নামে খোলা হয়েছিল। এসব সদস্যের মধ্যে অন্তত দুজন কমান্ডার রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী বেসামরিক মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র।
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকলেও রয়টার্সের অনুসন্ধানে পাওয়া নম্বরযুক্ত সংস্থাগুলোর কোনো একটিকে পশ্চিমা সরকারগুলো নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রেখেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের মধ্যেও আসছে ক্ষেপণাস্ত্রের উপকরণ
আমদানি নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইরানের সামরিক বাহিনী ১৯ লাখ ডলারের ডেটোনেটর, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, বিমানের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, রকেটের জ্বালানি তৈরির উপকরণ এবং ভারী যানবাহন আমদানি করেছে। অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপকরণ শাহেদ সিরিজের ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
আমদানি করা পণ্যের মধ্যে ছিল চীন থেকে আসা রাসায়নিক, রাশিয়ার ডেটোনেটর এবং ইউরোপ থেকে আনা ভারী ট্রাক ও বিমানের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ। কিছু চালান এসেছে কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে রাশিয়া থেকে জাহাজে, কিছু মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে, আবার কিছু চীন থেকে মালবাহী বিমানে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে এক মাসে ইরানে ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং পারক্লোরেট-জাতীয় রাসায়নিকের আওতাভুক্ত আরো ২৭৬ টন রাসায়নিক আনা হয়। রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে এসব উপাদান ব্যবহার করা যায়।
যুদ্ধ শুরুর পর মার্চে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির মাসিক মূল্য আগের মাসের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। তবে মে মাসে তা বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়। জুনে রাশিয়া থেকে আসে ১৯ লাখ ডলারের ডেটোনেটর। ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ ধরনের পাঁচটি চালানে মোট ৭৬ লাখ ডলারের ডেটোনেটর এসেছে।
ইরানের আমদানি করা সরঞ্জামের একটি বড় অংশের উৎস হিসেবে চীন, রাশিয়া ও জার্মানির নাম রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত অন্য দেশ থেকেও সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য ট্রাক, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও বিমানের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ এসেছে। এর মধ্যে ইতালীয় প্রতিষ্ঠান ইভেকোর তৈরি ট্রাকের মূল্যই ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
চীন ও রাশিয়া ইরানের যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করছে বলে বিশ্বাস করেন না বলে ১২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে আমদানি নথিতে ওই দুই দেশ থেকে সরঞ্জাম আসার তথ্য রয়েছে।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা প্রতিবেদনে বর্ণিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, হোয়াইট হাউস ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানি শাসনব্যবস্থার অর্থনৈতিক জীবনরেখা বিচ্ছিন্ন করেছে। তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক কর্মসূচির অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করলেও যুক্তরাষ্ট্র সব সময় দশ ধাপ এগিয়ে রয়েছে।
ভারী ট্রাকই ক্ষেপণাস্ত্রের চলমান উৎক্ষেপণযান
ইরানের সামরিক বাহিনী আমদানি করা ভারী ট্রাকের ব্যবহার গোপন রাখেনি। সামরিক কুচকাওয়াজ ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ফুটেজে টয়োটা ও ইভেকোর ট্রাক দেখা গেছে। এসব গাড়ি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বহন কিংবা ছদ্মবেশী চলমান উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এমওডি ৩৪৬৪২৮ নামের একটি সংস্থা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৩৫টি ইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। ২০২২ সালে ইতালিতে বসবাসকারী এক ইরানি গাড়ি ব্যবসায়ী ছয়টি ইভেকো ইউরোকার্গো ট্রাক কিনে দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইরানের বন্দর আব্বাসে পাঠিয়েছিলেন। নথিতে শেষ ক্রেতা হিসেবে এমওডি ৩৪৬৪২৮-এর পরিচয় নম্বর পাওয়া যায়। প্যাকিং তালিকায় সরবরাহের গন্তব্য হিসেবে ছিল সাহারা থান্ডার—ইরানের ড্রোন উৎপাদন ও সরবরাহে ভূমিকা রাখা একটি প্রতিষ্ঠান, যেটিকে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে।
একই সংস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার ট্রাকও আমদানি করা হয়েছে। এসব গাড়ির পেছনের খোলা অংশে ভারী মেশিনগান বসিয়ে ব্যবহার করে আইআরজিসি ও তাদের সহযোগী বাহিনী।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চারটি টয়োটা টুন্ড্রা আমদানির তথ্যও রয়েছে। আইআরজিসি ড্রোন বহনের কাজে এ ধরনের গাড়ি ব্যবহার করে। টয়োটা জানিয়েছে, ইরানে তারা কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে না এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কেনাকাটার বিষয়ে তাদের কোনো তথ্য নেই।
ইভেকোও বলেছে, তাদের পণ্য সামরিক কাজে ব্যবহার না করার বিষয়ে অনুমোদিত পরিবেশকদের চুক্তিগত নিশ্চয়তা দিতে হয়। তবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বিক্রি বা রপ্তানি করা পণ্যের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৫ সালে তেহরানের কাছে শনাক্ত করা বেশির ভাগ ট্রাকের গন্তব্য ছিল মধ্য এশিয়া।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিটার সালিসবারি বলেন, ‘এটি ইরানের বিদ্যমান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বহর পুনর্গঠন কিংবা আরো বড় করার শিল্পভিত্তিক উদ্যোগ বলে মনে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, তথ্যগুলো ইরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থার অভিযোজনক্ষমতা এবং বিকল্প পথ খুঁজে নেওয়ার সামর্থ্য তুলে ধরেছে।
ব্যাংকের নথি থেকে উন্মোচিত গোপন ব্যবস্থা
২৪০ অ্যানালিটিকসের বিশ্লেষক নোয়াম বিনস্টক ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ব্যাংক সেপাহর হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নম্বরযুক্ত সংস্থাগুলোর সন্ধান পান। নথিগুলো টেলিগ্রাম ও উইকিইরান ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিল। ব্যাংক সেপাহ আইআরজিসির সদস্যদের বেতন ও পেনশন পরিশোধ করে।
প্রথমে ব্যাংক হিসাবের বিপুল অর্থ দেখে তিনি ভেবেছিলেন, দশমিকের অবস্থান ভুল হয়েছে। পরে দেখা যায়, ৩৬টি সংস্থার বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে জমা ছিল ১২০ কোটি ডলার। নেটওয়ার্কের অন্য সংস্থাগুলোর স্থানীয় মুদ্রার হিসাবে ছিল আরো প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।
প্রতিটি সংস্থার আলাদা ১১ অঙ্কের সরকারি পরিচয় নম্বর রয়েছে। ব্যাংকের হিসাব, চালান, আমদানি নথি ও কোম্পানি নিবন্ধনে এই নম্বরগুলো বারবার পাওয়া গেছে। ফলে নাম গোপন করতে বিদেশি কাগুজে কোম্পানি ব্যবহার করলেও সংস্থাগুলোর কার্যক্রম অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছে।
এমওডি ৩৪৬৪২৮-এর আমদানি ২০২৩ সালের মার্চে শেষ হওয়া ১২ মাসে ছিল ৪৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। পরের ১২ মাসে তা বেড়ে হয় ৯৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সংস্থাটি মোট ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে বলে আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে রয়টার্স।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চীন থেকে বন্দর আব্বাসে ৮৮৬ টন রাসায়নিকও আনে সংস্থাটি। এসব রাসায়নিকের মধ্যে ছিল সোডিয়াম ক্লোরেট ও অন্যান্য পারক্লোরেটজাতীয় উপাদান, যা কঠিন রকেট জ্বালানি তৈরিতে কাজে লাগে। শেষ চালান পৌঁছানোর তিন দিন পর বন্দর এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
২৬ এপ্রিলের ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন। ঘটনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেছেন, বন্দরের কনটেইনারে থাকা সোডিয়াম পারক্লোরেট জ্বলে ওঠায় বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে শেষ চালানের ৭৫ টন রাসায়নিকই বিস্ফোরণের কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
রাসায়নিকগুলো যে প্রতিষ্ঠানের গুদামে রাখা হয়েছিল, সেই সিনা পোর্ট অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন বুনিয়াদ মোস্তাজাফানের মালিকানাধীন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই বুনিয়াদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হোসেইন দেকান ২০১৩ সালে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। বিস্ফোরণ ও সামরিক সংস্থাগুলোর বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তিনি সাড়া দেননি।
নিষেধাজ্ঞার জাল, যুদ্ধের চাপ—তবু পথ খুঁজছে ইরান
‘অ-তে অজগর ওই আসছে তেড়ে’—বাংলা বর্ণপরিচয়ের সেই ছড়ার মতোই ইরানের সামনে একের পর এক বিপদ এসে হাজির হয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক হামলা—সব মিলিয়ে দেশটিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু ইরানের গল্প শুধু চাপের মুখে বিপর্যস্ত হওয়ার গল্প নয়; প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার পথ খুঁজে নেয়ার গল্পও।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের নেটওয়ার্ক কেবল বিদেশ থেকে অস্ত্রের উপকরণ আনার ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক হিসাব, তেল বিক্রির অর্থ, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং দেশের ভেতরের নানা সংস্থাকে যুক্ত করে গড়ে উঠেছে এর বিস্তৃত কাঠামো। যুদ্ধের মধ্যেও সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করেছে ইরান। এতে বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা থাকলেও সেই ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর করে দেয়া সম্ভব হয়নি।
এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইরানের আধা-সরকারি ফাউন্ডেশনগুলোর যোগসূত্রের কথাও এসেছে অনুসন্ধানে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অভিযোগ, এবং বিক্ষোভ দমনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। খুজেস্তানে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু এবং আইআরজিসির এক কমান্ডারের ভূমিকা নিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে এসব অভিযোগের পাশাপাশি বৃহত্তর বাস্তবতাটিও মনে রাখা দরকার—ইরান দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক হুমকির মুখে রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে কেবল একটি গোপন সরবরাহ নেটওয়ার্কের বিবরণে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।
নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যাঁরা যুক্তি দেন, তাঁদের বক্তব্য হলো, এর মাধ্যমে ইরানের সামরিক শক্তি ও দমনমূলক ব্যবস্থাকে দুর্বল করা সম্ভব। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাস আর সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, চাপ বাড়ালেই কোনো দেশ আত্মসমর্পণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং বিকল্প সরবরাহপথ খোঁজা, নিজস্ব সক্ষমতা ধরে রাখা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা চলতে পারে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।
তাই ইরানের সামনে এখনো ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’। অর্থনৈতিক দুর্দশা, যুদ্ধের ক্ষতি ও নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা দেশটির জন্য বড় বোঝা। কিন্তু ‘অ-তে অজগর’ দিয়ে যে আতঙ্কের ছবি আঁকা হয়, ইরানের ভবিষ্যৎকে শুধু সেই ছবিতে আটকে রাখা যায় না। নিষেধাজ্ঞা ও হামলার মুখেও দেশটি নিজের পথ খুঁজছে। এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই—একটি দেশকে দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ রেখে তার সক্ষমতা কতটা কমানো যায়, আর সেই চাপের মধ্যেও তার টিকে থাকার চেষ্টা কত দিন উপেক্ষা করা সম্ভব?
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








