
সাংবাদিকতার সংস্কৃতিতে আপামর জনগোষ্ঠীর কপালে যখন তাচ্ছিল্য, বিরক্তি ও অবিশ্বাসের রেখা—যখন মিথ্যার আশ্রয়ে সত্য পরাভূত এবং অন্ধকারে পথ হারিয়ে গুমরে কাঁদছে, ঠিক তখন ‘সত্যের সঙ্গে প্রতিদিন’ শ্লোগান নিয়ে স্নিগ্ধভোরের কুসুমকানন থেকে শ্বাপদ-সঙ্কুল-মধুর পথে ২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর শিখাতারার এক মার্বেলখচিত পদযাত্রায় শুরু হল দৈনিক নয়া দিগন্তের পথচলা।
শঠ-তঞ্চকের প্রপঞ্চ আর লু-হাওয়ার দমক মাড়িয়ে হিমালয়ের বিশালতায়—যার হৃদয়ে বেজে উঠেছিল সংবাদ-সংস্কৃতির বিকল্প অথচ নির্ভিক সংবাদ পরিবেশনের জগঝম্প, তিনি সময়ের আকর ছিঁড়ে অনন্ত অসীমে পাড়ি জমানো— জীবনসফল বুজুর্গ মীর কাসেম আলী।
তার সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের সাহসী সারথি হিসেবে সকলপ্রকার সুযোগ-সুবিধা, পৃথিবীর প্রলোভন-মোহমায়া ত্যাগ করে পত্রিকাটির সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের অসামান্য অথচ কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সাংবাদিক আলমগীর মহিউদ্দিন ও সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। সম্পাদকীয়, চিফ রিপোর্টার আর ফিচার বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে বিপুল উৎসাহে সংবাদ মাধ্যমের জাতীয় চৈতন্য জাগরণে এগিয়ে আসেন যথাক্রমে মাসুদ মজুমদার, মাসুম খলিলী, মুজতাহিদ ফারুকী।
বাঁক বদলের ঐতিহাসিক যাত্রায়—দারিদ্র্যপিড়ীত জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের জোনাকি জ্বেলে ২০ পৃষ্ঠার এক ব্যাপক আয়োজনে সত্য-সুন্দর এক ক্যানভাস এঁকে, মাত্র পাঁচ টাকায় পাঠকের হাতে তুলে দেয়া হয় পত্রিকাটি। যা আলোচিত সময়ের আলোড়িত ঘটনা বৈ-কী! এরপর কতচন্দ্রভূক অমাবস্যা বেয়ে প্রকাশিত হল আরো কত ধরনের দৈনিক, কিন্তু সেই আলোড়ন—চাঁদের জোছনাস্রোতে ইতিহাসই হয়ে রইলো সময়ের বৈঠায়।
আকাশচুম্বী সম্ভাবনা যখন বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক হয়ে জনআকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সংবাদকর্মীদের মনোঃজগতে শুরু করেছে ফলপ্রসূ এক বিনির্মাণ এনে দেয়ার জয়োধ্বনি, ঠিক তখন—২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ক্ষুধার্ত দুপুরে একদল বনশকুনের আগুনোম্মাদনা থামিয়ে দিতে চাইলো কোটি মানুষের হৃদস্পন্দ। জ্বালিয়ে দেয়া হলো পত্রিকাটির অফিস।
১৭৫৭ সালে যেখানে বাঙলায় একজন কপর্দকশূন্য মুসলিম পাওয়া যেত না, ঠিক তার ১০০ বছর পর সেখানে দেখা যায়— একজন সম্পদশালী মুসলিমকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ঠিক এভাবে পত্রিকাটির অফিস জ্বালিয়ে দেয়ার পর স্বচ্ছল একজন কর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে গেল। তারপরও ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরতিহীন ১৭ বছরে বিন্দুকে বৃত্তে আটকে রাখার খেলায় নিঃশেষ হতে হতে পৃথিবীর ১৭ প্রদক্ষিণ শেষে ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে উঠলো পত্রিকাটি। তথাপি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সরকারি বিজ্ঞাপনের আয় যে পর্যায়ে ছিল—এখন তার এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এটি নয়া দিগন্তের কর্মীদের জন্য অশনি সঙ্কেত।
সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে যেয়ে বলেন, ‘নয়া দিগন্ত আজ মরে বেঁচে আছে। যে পত্রিকাটি আপনার মতো স্বাধীন নয়, যে পত্রিকাটি ২২ বছর বয়সের মধ্যে ১৭ বছরই হেজিমনিতে আক্রান্ত, তার পক্ষে কতটুকু করা সম্ভব? তারপরও পত্রিকাটি যদি কিছু করতে পারে তার জন্য শুকরিয়া আদায় করে বলতে হয়—আলহামদুল্লিাহ। আর যদি কিছু করতে না পারে তাহলে এর দায় কী কেবল আমাদের? দীর্ঘ ১৭ বছর জাতি একটা দুর্বিষহ সময় কাটিয়েছে, আমরা তার বাইরে ছিলাম না। নয়া দিগন্ত যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের ব্যর্থতা কেবল আমাদের না। মূলত : এর দায় ফ্যাসিবাদী সরকারের।’
তিনি আশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যহত রাখব। যে দুঃসময় পার করে এসেছি তার থেকে আজও কিন্তু আমরা বের হতে পারিনি। আল্লাহ যদি তাওফিক দেন—আমাদের যোগ্যতার ঘাটতি আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু যে উপস পালে তার জন্য সৃষ্টিশীল কিছু করা সম্ভব নয়। আল্লাহর রহমতে এই সংবাদপত্রের সকল স্তরের কর্মীদের একক সাহসী ভূমিকায় পত্রিকাটি এখনো জ্বলজ্বল করছে। জাতির জন্য আমাদের যে প্রতিশ্রুতি তার বাস্তবায়নে আমরা জনগণের পাশে থাকব ইনশাআল্লাহ।’
পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক মাসুম খলিলী বলেন, ‘দৈনিক নয়া দিগন্ত এক স্বপ্নচারি মানুষের চিন্তা থেকে শুরু হয়েছিল। এই অভিযাত্রাকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের অনায্য বিচারে জীবনাবসানে—পত্রিকাটির কাণ্ডারী হিসেবে আর দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এরপর থেকে মূলত নয়া দিগন্তের ওপর নানান ধরনের বৈরী অবস্থা নেমে আসে। সেই প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই নয়া দিগন্ত আজ ২০২৬ সালে ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। আমরা যেহেতু দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার প্রতি ওয়াদাবদ্ধ, সেহেতু সেই ওয়াদাকে রক্ষা করতে আমরা এইসব প্রতিকূলতা ও বৈরীতা জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।’
সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান মুজতাহিদ ফারুকী স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যমে আদর্শিক পদযাত্রায় বহুলপ্রচারিত দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা ছেড়ে দৈনিক নয়া দিগন্তের ফিচার বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করি। এবং তৎকালীন সময়ে চলমান পত্রিকাসমূহের ফিচার বিভাগের তুলনায় নয়া দিগন্তের ফিচার বিভাগকে উন্নিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম।’
অপার সম্ভাবনার ২০২৪ -এর পাঁচ আগস্টের দুর্বিনীত পরিবর্তনের পর সচেতনমহল, বোদ্ধা, বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্ন একটিই—কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক সরকারের সুসভ্য সময়ের জোয়ারের হালে পাল তুলে শতবঞ্চিত, নির্যাতিত জনআকাঙ্ক্ষার জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যমটি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা-কলবর নিয়ে আলোড়িত ক্যানভাসে মার্বেলখচিত পদযাত্রায় ফিরতে পেরেছে কি?
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








