জলাবন্ধতা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য,  আফ্রিকা, পানিসঙ্কটাপন্ন,  পানি শোধন,  সরবরাহ, প্রযুক্তি বিক্রি, বড় শক্তি,  চীন, বাংলাদেশ, ঢাকা, ওয়াসা,
পানি-বণিক চীন। সংগৃহীত

পানি লাগবে, পানি চাই, পানি! ছোটবেলায় স্টিমার, বাস কিংবা ট্রেনে এই হাঁকডাক ছিল চেনা দৃশ্য। ফেরিওয়ালার কাছে পানি মিলত, সাথে থাকত ঘৃতকুমারী, চাক চাক লেবু কিংবা তকমা দেয়া সরবত। যতদূর মনে পড়ে, সরবত কিনলে পানি মিলত মাগনা। এখন অবশ্য পানির চেহারা বদলেছে। হিমযন্ত্র থেকে বের করা ঠান্ডা মিনারেল ওয়াটারের বোতল হাতে হাতে ঘোরে। আর সেই পানির ব্যবসাকেই এবার অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে চীন। আমাদের ফেরিওয়ালা বোতলভর্তি পানি বেচতেন, চীন নামছে পানি তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্ববাজারে। পণ্য সেই একই—পানি। তবে ফেরিওয়ালার হাঁক আর চীনের বাণিজ্যের পরিধি এক নয়!

Advertisement
পানি নুনমুক্ত করার চীনা প্রকল্প

 

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন জানায়, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার পানিসঙ্কটাপন্ন দেশগুলোর কাছে পানি শোধন ও সরবরাহের প্রযুক্তি বিক্রিতে বড় শক্তি হয়ে উঠছে চীন। নিজ দেশেই পানির প্রাকৃতিক উৎস কমে আসায় বেইজিং মিঠাপানি তৈরির প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে সমুদ্রের নোনা পানি নুনমুক্ত করার ঝিল্লি, পানি পরিশোধনের যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশলসেবা বিক্রি করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড হলো চীনের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। পানি নুনমুক্ত করার কাজে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন চীনের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কিনছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্যসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন ২০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পানি ছাঁকা ও বিশুদ্ধ করার যন্ত্রপাতি রপ্তানি করেছে। ২০২০ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৬০ কোটি ডলার। পাঁচ বছরে রপ্তানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ভন্ট্রন টেকনোলজি গত বছর বেল্ট অ্যান্ড রোডভুক্ত দেশগুলোতে ৩০ হাজারের বেশি সমুদ্রের নোনা পানি নুনমুক্ত করার ঝিল্লি পাঠিয়েছে। বিশেষ এই পাতলা পর্দা পানি থেকে লবণ ও অন্যান্য অমিশ্রণ আলাদা করতে সাহায্য করে। এসব ঝিল্লি দিয়ে দৈনিক তিন লাখ টনের বেশি পানি উৎপাদন সম্ভব। জানুয়ারিতে পাওয়ারচায়না তানজানিয়ায় এমন একটি পানি সরবরাহ প্রকল্প নির্মাণের কথা জানায়, যা সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষের চাহিদা মেটাতে পারবে।

নিজের পানির সঙ্কটও কম নয়

চীন শুধু অন্য দেশের পানির চাহিদা মেটানোর ব্যবসা করছে না, নিজের পানির সঙ্কটও সামলাতে চাইছে। হংকংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চায়না ওয়াটার রিস্কের হিসাবে, ২০১৫ সাল থেকে দেশটিতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় বেড়েছে সামরিক ব্যয়ের চেয়েও দ্রুত। এখন এ খাতে বছরে ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ইউয়ানের বেশি, যা প্রায় ১৭ হাজার কোটি ডলার।

তিব্বতের হিমবাহ থেকে উৎসারিত নদীগুলো দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানির জোগান দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনে সেই উৎসগুলো ক্ষয় হচ্ছে। উত্তর চীনে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতেও পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত আগস্টে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস প্রাকৃতিক পানির উৎসের ঝুঁকি আবারো সামনে আনে।

চায়না ওয়াটার রিস্কের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে এশিয়ার প্রতি দুইজনের একজনকে পানি জোগানো ১০টি বড় নদীব্যবস্থায় পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কমতে শুরু করতে পারে। এতে ১৬টি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক ঝুঁকিতে পড়বে।

 পানি এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন

জুলাইয়ে চীন নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় পানিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেশটির মিঠাপানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে ভূপৃষ্ঠের উৎস থেকে। পুনর্ব্যবহৃত পানি, নোনা পানি নুনমুক্ত করে পাওয়া পানি ও বৃষ্টির পানি মিলে জোগান দেয় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। সরকার এই অংশ বাড়াতে চায়।

দক্ষিণ-উত্তর পানি স্থানান্তর প্রকল্পের মাধ্যমে ইয়াংসি নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি শুষ্ক উত্তরাঞ্চলে নেয়া হয়। তবে জ্বালানির ব্যয় এবং উষ্ণ হয়ে ওঠা ইয়াংসি অববাহিকায় পানির উদ্বৃত্ত কমে আসায় প্রকল্পটি বাধার মুখে পড়ছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষে চীনে ১৬৭টি সমুদ্রের পানি নুনমুক্ত করার প্রকল্প চালু ছিল। এগুলোতে দৈনিক মোট ৩০ লাখ ৭৬ হাজার ৮০৫ টন পানি উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২ লাখ ২১ হাজার ২৮৩ টন বেশি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের হিসাবে, প্রতি ঘনমিটার পানি উৎপাদনে খরচ পড়ে ৪ থেকে ৮ ইউয়ান।

শিল্পসংক্রান্ত পূর্বাভাস বলছে, এ বাজারের আকার ২০২৪ সালের ১৮৪ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৩ সালে ৪৬৬ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ১১ শতাংশ। তবে বিপুল বিনিয়োগ, একাধিক শহরে পানি পৌঁছানোর অবকাঠামো এবং মানুষের অনীহা বড় বাধা। সৌদি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান আকওয়ার চীনপ্রধান সালেহ আল খাবতি বলেন, অনেক চীনা এখনো নুনমুক্ত করা পানি পান করাকে ভালো চোখে দেখেন না।

 বিশ্ববাজারে চীনের পানির ব্যবসা

তবু বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের প্রযুক্তির ওপর ভরসা রাখছে। খাবতির হিসাবে, আকওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির যেসব সরঞ্জাম কেনে, তার ৯০ শতাংশের বেশি আসে চীনা নির্মাতাদের কাছ থেকে। বিশ্বজুড়ে পানি-প্রযুক্তির সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও চীনের সরবরাহকারীরা জোগান দেন প্রায় ৭০ শতাংশ।

২০৩০ সালের মধ্যে চীনে সর্বোচ্চ ৩০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আকওয়া। পাওয়ারচায়না ও চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করছে তারা। আগামী তিন বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ হাইড্রোজেন ও পানি নুনমুক্ত করার প্রযুক্তিতে চীনা সরঞ্জাম কিনতে বছরে অন্তত ১৫০০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সবুজ হাইড্রোজেন হলো নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদিত হাইড্রোজেন।

খাবতির আশা, চীনা ঝিল্লি নির্মাতারা দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে বর্তমান শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সমকক্ষ হয়ে উঠবে। বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের মতো পানি শোধনের প্রযুক্তিও চীনের বড় রপ্তানি খাত হয়ে উঠতে পারে। তাঁর কথায়, ‘চীনকে নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। একবার জায়গা করে নিতে পারলে চীনই হবে এ খাতের নেতা।’

 বাংলাদেশের পানির হিসাব কে মেলাবে?

চীনের পানির ব্যবসার কথা হলো। এবার বাংলাদেশের দিকে তাকাই। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’—কবির এই পঙ্‌ক্তি আমাদের গর্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সুপেয় পানির প্রশ্নে সেই গর্বের সাথে কতটা স্বস্তি মেলে?

'চাহিবা মাত্র' পাওয়া যায় না!

 

ঢাকায় কল খুলে সরাসরি গ্লাস ভরে ওয়াসার পানি খাওয়ার ও আশা করা কি সম্ভব?  খাওয়ার আগে পানি ফুটিয়ে কিংবা অন্য উপায়ে বিশুদ্ধ করে নিতে হয়। এ সুযোগ সুপেয় পানি নিয়ে নানা ব্যবসা প্রতিদিনই নাগরিকদের গরিব পকেট থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা মুনাফা। বৃষ্টি নামলেই নগরীর বহু রাস্তা পানিতে ডুবে যায়। জলাবদ্ধতা কাটতে সময় লাগে, দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। মির্জা গালিবের নামে প্রচলিত একটি পঙ্‌ক্তির ভাবার্থ মনে পড়ে—এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে ছাদ থেকে ঘরের ভেতরে যেন দুই ঘণ্টা ধরে পানি পড়ে। ঢাকার বর্ষায় দৃশ্যটা যেন উল্টো। ছাদে পানি ধরে রাখার বদলে রাস্তায় জমে থাকা পানির স্রোত সামলাতেই নগরবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়।  বৃষ্টির পানি ধরে রেখে কাজে লাগানোর উদ্যোগ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ক্রমে নিচে নামছে। একদিকে পানি জমে শহর অচল হয়, অন্যদিকে নিরাপদ পানির জন্য মানুষকে ভাবতে হয়—এ কেমন ব্যবস্থা?

ঢাকার রাস্তায় জমে থাকা পানির স্রোত সামলাতেই নগরবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত!

 

চীনের কাছ থেকে আমাদের শেখার আছে। তাদের প্রযুক্তি হুবহু নকল করার দরকার নেই; দরকার নিজেদের বাস্তবতা বুঝে পরিকল্পনা করা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানির অপচয় রোধ, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্যপানি শোধন এবং সুপেয় পানি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য চাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সদিচ্ছা।

আমাদের পানি-ফেরিওয়ালার হাঁক ছিল, ‘পানি লাগবে, পানি চাই!’ আজ চীন সেই পানির ব্যবসাকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। সমুদ্রের নোনা পানিকে নুনমুক্ত করে মিঠাপানি বানানোর প্রযুক্তি বিক্রি করছে তারা। আর আমরা এখনো বৃষ্টির পানিকে সম্পদে পরিণত করার কাজটাই ঠিকমতো গুছিয়ে উঠতে পারিনি।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি শুধু পানি কোথায় পাব, তা নয়; প্রশ্ন হলো, যে পানি আছে, তাকে কীভাবে বাঁচাব, শোধন করব এবং মানুষের ঘরে পৌঁছে দেব। কে নেবে এই দায়িত্ব? কার পরিকল্পনায় একদিন বৃষ্টির পানি আর দুর্ভোগের কারণ হবে না, বরং হয়ে উঠবে সম্পদ? কবির সেই স্বপ্নের দেশকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে জল-নুপুরের ছন্দ শুধু কবিতায় রাখলে চলবে না—তার সুর ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের নগর ও জনপদেও।