নির্যাতন, প্রমাণ, ইসরাইল, টেজার, অ্যাক্সন, ফিলিস্তিনি বন্দী, শক,
অ্যাক্সনের অস্ত্র। সংগৃহীত

ইসরাইলের সেনারা ওই ব্যক্তিকে টেনেহিঁচড়ে কারাগারের একটি অংশে নিয়ে যায়। জায়গাটি পরিচিত ‘হেলস উইং’ বা ‘নরকের ডানা’ নামে। বন্দীদের ওপর নির্মম নির্যাতনের জন্যই এ অংশের এমন নাম দেয়া হয়েছে। সেনারা তাকে সজোরে এক কোণে ঠেলে দেয়। এরপর একজন সেনা অস্ত্র বের করে তার শরীরে রাবারের দুটি গুলি ছোড়ে। দুই পা-ই কাটা ওই ব্যক্তি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

Advertisement

তাকে শক্ত করে বেঁধে রাখার পরও সেনাদের মারধর চলতে থাকে। একপর্যায়ে একজন সেনা কোমরের খাপ থেকে বৈদ্যুতিক শক দেয়ার বন্দুক বের করেন। সেটি ওই ব্যক্তির শরীরে ঠেকাতেই তীব্র বিদ্যুতের শক লাগে।

ইসরাইলের কারাগারে আটক থাকার সময় নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এ কথা বলেছেন ইসা। ঘটনার দেড় বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিদ্যুতের শকের ফলে সৃষ্ট ক্ষতচিহ্ন এখনো তার শরীরে স্পষ্ট। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনবিষয়ক আন্তর্জাতিক পরিষদের মতে, পাশাপাশি থাকা দুটি ক্ষতচিহ্ন থেকে ধারণা করা যায়, হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রাখা অবস্থায় তাকে বারবার বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছিল।

বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী ইসাকে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে গ্রেফতার করা হয়। ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তার বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি ওই শিবিরে রয়েছেন। তাকে ইসরাইলের ওফার কারাগারে রাখা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি মুক্তি পান।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জানায়, আরব সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী সংগঠন আরব রিপোর্টার্স ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের সাথে যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইসাকে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্সন এন্টারপ্রাইজের তৈরি টেজার অস্ত্র দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। কোম্পানিটির আগের নাম ছিল টেজার ইন্টারন্যাশনাল।

অ্যাক্সনের অস্ত্র দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে একই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তি পাওয়া আরো তিন বন্দী।

 নির্যাতনের অভিযোগ, তবু অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত

ইসরাইলের আটককেন্দ্র ও কারাগারে বন্দীদের বারবার নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এসব ঘটনায় বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ ধরনের যন্ত্র রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, বন্দীদের নির্যাতন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বন্দীদের বেঁধে রাখার ব্যবস্থা কেবল ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে, যখন তা ব্যবহারের যৌক্তিকতা থাকে’ তখনই নেয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ইসরাইলি আইন, আন্তর্জাতিক আইন ও সেনাবাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলা হয় বলেও দাবি ওই মুখপাত্রের।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সেদে তেইমান আটকশিবিরে এক ফিলিস্তিনি বন্দীর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে পাঁচ ইসরাইলি সেনার বিরুদ্ধে তদন্ত করেন দেশটির সামরিক অ্যাডভোকেট জেনারেল ইতাই অফির। তদন্তে দেখা যায়, বন্দীকে নির্যাতনের সময় সেনারা টেজার অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। এতে ওই বন্দীকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।

২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি ইসরাইলের আটককেন্দ্রগুলোতে নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক শক দেয়ার ঘটনাও ছিল। কমিটি জানায়, ‘২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।’

ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর ব্যাপক যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও গভীর উদ্বেগ জানায় কমিটি। এসব অভিযোগের মধ্যে ধর্ষণ, যৌন প্রকৃতির নির্যাতন এবং যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথে বৈদ্যুতিক শক দেয়ার ঘটনাও রয়েছে।

এতসব অভিযোগের পরও অ্যাক্সন ইসরাইলের বিভিন্ন সংস্থার সাথে চুক্তি করে টেজার অস্ত্র কিংবা এর আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে বলে দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনেও ইসরাইলে আয়োজিত এক সম্মেলনে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সামনে নিজেদের সর্বাধুনিক বৈদ্যুতিক শক দেয়ার অস্ত্রের মডেল দেখিয়েছে কোম্পানিটি।