
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, চারদিকে সবুজ চা বাগানের হাতছানি, পাহাড়ের কোলে স্বচ্ছ পানির মায়াবী লেক আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজার। দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা ১০ দিনের ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরশে অবকাশযাপন, প্রিয়জনদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি আর নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে এখন আনন্দমুখর পরিবেশ। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সাথে মেতে উঠেছেন আনন্দে। আবার কেউ প্রিয়জনের সাথে সেলফি তুলে কিংবা ক্যামেরায় প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য ধারণ করে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখছেন ছুটির সোনালি মুহূর্ত। পর্যটনকেন্দ্রগুলো ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানায়, গত কয়েক দিনে জেলার বাইরে থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটেছে। তাদের চাপে জেলার বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় শতভাগ রুম বুকিং হয়ে গেছে।
শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশে তুলার মতো সাদা মেঘের ভেলা। প্রকৃতির এমন মায়াবী রূপের সাথে সবুজ চা পাতার স্নিগ্ধতা যেন ভ্রমণপিপাসুদের বারবার কাছে টানে। শ্রীমঙ্গলসহ জেলার বিভিন্ন চা বাগানে দিনভর ঘুরে বেড়াচ্ছেন শত শত পর্যটক। পাহাড়ি পথ, চা গাছের সারি আর সবুজের বিস্তীর্ণ সমারোহে হারিয়ে গিয়ে তারা উপভোগ করছেন প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য।
বুধবার (২১ অক্টোবর) জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা স্থানগুলো। পূজার ছুটি ও অনুকূল আবহাওয়াকে ঘিরে তাদের এই ভ্রমণ-উচ্ছ্বাস চলবে আগামী শনিবার পর্যন্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্গাপূজার আনন্দের পাশাপাশি দীর্ঘ ছুটিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন ভ্রমণে। ইট-পাথরের নগরজীবনের চার দেয়াল পেরিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে অনেকেই সন্তানদের নিয়ে ছুটে এসেছেন দূর-দূরান্ত থেকে। তাদের কাছে এই ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, বরং একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়ারও উপলক্ষ।
সবুজের মায়ায় মুগ্ধ পর্যটকেরা
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা নারী পর্যটক মেধা বলেন, ‘সবুজ আমাদের হৃদয়জুড়ে আছে। মৌলভীবাজারের চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। একবার এখানে এলে আবার আসতে মন চায়।’
মাধবপুর লেকে কথা হয় ঢাকা থেকে আসা আরেক পর্যটক বুরহানের সাথে। তিনি বলেন, ‘ইট-পাথরের শহর থেকে চায়ের রাজ্যে এসে খুব ভালো লেগেছে। এখানে পাহাড়ের পাদদেশে রয়েছে নীল পানির মায়াবী লেক। চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মনকে অন্য রকম প্রশান্তি দেয়।’
কিশোরগঞ্জ থেকে প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজারে বেড়াতে এসেছেন অন্তিকা ঘোষ। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার একসাথে দু’টি কাজ হয়েছে। পূজা দেখা হয়েছে, পাশাপাশি মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, বধ্যভূমি-৭১, মাধবপুর লেকসহ বেশ কয়েকটি চা বাগান ঘুরে দেখেছি। যত দেখি, ততই ভালো লাগে।’
টাঙ্গাইল থেকে আসা পর্যটক প্রান্ত বলেন, ‘শ্রীমঙ্গলকে সবুজ চা বাগান যেন চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। আমি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেড়াতে যাই, কিন্তু এমন সুন্দর দৃশ্য খুব একটা দেখিনি। এখানে এসে সত্যিই খুব ভালো লেগেছে।’
স্থানীয় পর্যটক ও শিক্ষক শিউলি গৌড় বলেন, ‘চাকরিজীবী হওয়ায় বেড়ানোর সময় খুব একটা হয়ে ওঠে না। এবার টানা ছুটি থাকায় মাধবপুর লেকে বেড়াতে এসেছি। স্বজনদের সাথে পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারছি। কিছুক্ষণের জন্য মনে হচ্ছে, সবুজের মাঝে হারিয়ে গেছি।’
পর্যটকের সমাগম, অবকাঠামো উন্নয়নের প্রত্যাশা
পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সাবেক সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, ‘টানা ছুটিতে মৌলভীবাজারে যথেষ্টসংখ্যক পর্যটক আসছেন। হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় শতভাগ রুম বুকিং হয়ে গেছে। বিভিন্ন উৎসব ও ছুটির সময়ে যে পরিমাণ পর্যটক আসেন, বছরের অন্য সময়ে সে তুলনায় পর্যটকের সংখ্যা কম থাকে। অথচ পর্যটনের এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়ানো দরকার।’
তিনি মনে করেন, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন, যাতায়াতব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণ এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা গেলে মৌলভীবাজারের পর্যটনশিল্প আরো বিকশিত হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি কর্মসংস্থানেরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নিরাপত্তায় তৎপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৌলভীবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সদস্যরা সমন্বিতভাবে দিন-রাত কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’
শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর সবুজ চা বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে মৌলভীবাজার এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের এক প্রিয় আশ্রয়। উৎসবের আনন্দ আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে পর্যটকদের এই আগমন জেলার পর্যটনশিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজার হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








