ইসরাইলি কারাগার, ফিলিস্তিনি নারী, নির্যাতন, জোর করে হিজাব খোলা, মরিচের স্প্রে,  মারধর,
ফিলিস্তিনি এক নারী বন্দি আর একাধিক ইসরাইলি সেনা। সংগৃহীত

 

Advertisement

ইসরাইলের কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনি নারীদের জোর করে হিজাব খুলতে বাধ্য করা, মারধর, নির্জন প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা এবং কাঁদানে গ্যাস ও মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ছুড়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এতে কয়েকজন বন্দি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে চিকিৎসার জন্য কারাগারের ক্লিনিকে নিতে হয়েছে। কিন্তু তার চিকিৎসার কোনো বিবরণ পাওয় যায়নি।

নির্যাতিত বন্দিরা কান্নায় ভেঙে পড়ছে

ফিলিস্তিনের গাজাভিত্তিক সংবাদ সংস্থা সাফা প্রেস অ্যাজেন্সি ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলের খবর, ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে সংস্থাটি। ইসরাইলি দখলদারিত্ব ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের খবর তুলে ধরার ক্ষেত্রে  গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানীয় সংবাদসূত্র এ সংস্থা। তবে বিভিন্ন গবেষণায় হামাসের সাথে সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে। সাফা জানায়, বন্দিদের গণমাধ্যম দপ্তর ৭ ও ৮ অক্টোবরের নির্যাতনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করেছে। দপ্তরের অভিযোগ, ইসরাইলি কারারক্ষীরা নারীদের হিজাব খুলে চুল উন্মুক্ত করতে, মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে এবং গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থের ঝাঁজ সহ্য করতে বাধ্য করেন।

৭ অক্টোবর ১৭ জন ফিলিস্তিনি নারীকে প্রায় তিন ঘণ্টা ১৩ নম্বর প্রকোষ্ঠে আটকে রেখে চুলের বেণি খুলতে বাধ্য করা হয়। এর আগে এক ইসরাইলি কর্মকর্তা চুল পরীক্ষা করার জন্য তাঁদের হিজাব খুলতে বলেন। বন্দিদের গণমাধ্যম দপ্তরের ভাষ্য, এভাবে নারীদের চুল উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা এবং আটকে রাখা তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার ওপর অপমানজনক আঘাত।

নির্যাতন সেখানেই থেমে থাকারাগারের নারী বন্দিদের অংশের উঠানে কাঁদানে গ্যাস ও শব্দবোমা ছোড়া হলে কয়েকজনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরে বিভিন্ন প্রকোষ্ঠ থেকে বন্দিদের বের করে প্রায় এক ঘণ্টা মেঝেতে উপুড় করে রাখা হয়। এরপর তাঁদের গ্যাসে ভরা প্রকোষ্ঠে ফিরিয়ে নেয়া হয়। ৯ নম্বর প্রকোষ্ঠে অভিযান চালিয়ে নারীদের পায়েও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

৮ অক্টোবর ১৫ জন নারী বন্দির একটি কক্ষে বিপুল পরিমাণ মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ছোড়া হয়। এর ঝাঁজ পাশের কক্ষগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। বন্দিরা বমি করতে থাকেন, অসুস্থ হয়ে পড়েন বয়স্ক নারীরাও। একজনকে অন্য বন্দিদের কোলে করে নিতে হয়, আরেকজন হাঁটতে পারছিলেন না। গোসলখানায় থাকা নারীদের ওপরও রাসায়নিক পদার্থ ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে। আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে কারাগারের ক্লিনিকে নেয়া হয়। তবে তাঁর অবস্থা ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

ফিলিস্তিনি বন্দি সমিতির ১২ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, ইসরাইলের কারাগারে ৮৭ জন ফিলিস্তিনি নারী বন্দি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২১ জন প্রশাসনিক আটকাদেশের আওতায় রয়েছেন। এ ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের আটক রাখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে আটকের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত তথ্য বন্দি ও তাঁদের আইনজীবীদের কাছেও গোপন রাখা হয়। নারী বন্দিদের নির্জন প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা, চিকিৎসায় অবহেলা, দুর্ব্যবহার এবং খোসপাঁচড়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়া নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি।

 

নির্যাতন ও কারাবাসের শিকার নারীদের মধ্যে রয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি সাংবাদিক বুশরা আল-তাওয়িল। বন্দি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ দিন ধরে তাঁকে নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়েছে। তাঁর ওপর বারবার মারধর, মরিচের গুঁড়ার স্প্রে প্রয়োগ ও অপমানজনক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। ১২ অক্টোবর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রশাসনিক আটকাদেশ আরো চার মাস বাড়িয়েছে। ফলে অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই তাঁর কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়েছে। বারবার কারাগার বদলানোর কারণে তাঁর সাথে আইনজীবীদের সাক্ষাৎ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা ও কারাগারে তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করা হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে বন্দিদের গণমাধ্যম দপ্তর। মারধর, জোরপূর্বক নির্জন কারাবাস, অপমানজনক তল্লাশি এবং কাঁদানে গ্যাস ও মরিচের গুঁড়ার স্প্রে ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়েছে তারা। আহত, অন্তঃসত্ত্বা, বয়স্ক ও অসুস্থ বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারাগারের পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণেরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।