
ওরে আয়! ওই মহা-সিন্ধুর পার হতে ঘন রণ-ভেরী শোনা যায়! ওরে আয়! ওই ঝননননন রণ-ঝনঝন ঝনঝনা শোনা যায়!
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী পঙক্তির 'মহা-সিন্ধু' কথাটিকে কেটে যদি আজ সেখানে 'মহাকাশ' বসিয়ে দেয়া হয়, তবে হয়তো বিন্দুমাত্র ভুল হবে না। মানবজাতি তার আদিলগ্ন থেকেই শান্তির স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু বারবারই তাকে তাড়া করে ফিরেছে যুদ্ধের অমোঘ অভিশাপ। সময়ের চাকা যত গড়িয়েছে, যুদ্ধের চেনা ভূখণ্ডও তত বদলে গেছে। জল-স্থল আর অন্তরীক্ষ, মাটি, পানি আর আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে লড়াইয়ের সেই বিষাক্ত আগুন এবার ছড়াতে চলেছে অসীম মহাকাশে।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের (১৭ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পৃথিবীর কক্ষপথে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বেঁধে যেতে পারে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের এমন আশঙ্কার পর থেকে নিজ দেশের উপগ্রহগুলোর সুরক্ষায় বেসামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে যুক্তরাজ্য।
মহাকাশের জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ প্রযুক্তি সংস্থা 'অ্যাস্ট্রোস্কেল'। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানটিই এখন যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু গোপন সামরিক প্রকল্পে। শত্রু দেশের সামরিক বা নজরদারি উপগ্রহকে কীভাবে কুপোকাৎ করা যায় কিংবা প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, সে কাজে নিজেদের প্রযুক্তিকে নতুন করে ঢেলে সাজাচ্ছে তারা। এর পাশাপাশি মহাকাশে ভাসমান উপগ্রহে জ্বালানি সরবরাহের কাজ করা 'অরবিট ফ্যাব' নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও এখন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য একটাই, মহাকাশে আক্রমণ ও আত্মরক্ষার নানা কৌশল তৈরি করা।
সম্প্রতি লন্ডনে অ্যাস্ট্রোস্কেলের এক আলোচনায় কিং'স কলেজ লন্ডনের ফ্রিম্যান এয়ার অ্যান্ড স্পেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. জুলিয়া বাম এক আশঙ্কাজনক তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, মহাকাশে মিত্র দেশগুলোর উপগ্রহ প্রতিদিন কোনো না কোনো প্রতিপক্ষের নাশকতামূলক চেষ্টার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। কক্ষপথে যেভাবে কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা বাড়ছে এবং সেগুলোর প্রযুক্তিগত শক্তি জোরালো হচ্ছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই মহাকাশ এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ময়দানে পরিণত হতে পারে।
ড. বামের মতে, শত্রু দেশ যদি বুঝতে পারে যে আমাদের উপগ্রহ অচল করে দিয়ে সামরিক যোগাযোগ বা বেসামরিক অবকাঠামো স্তব্ধ করা সম্ভব, তবে তারা মহাকাশকেই চাপ দেওয়ার সবচেয়ে সহজ হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেবে। তাই এখন থেকেই এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, আধুনিক মানুষ আজ পুরোপুরি উপগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। কৃত্রিম উপগ্রহ অচল হলে বা জিপিএস সংকেত বন্ধ হয়ে গেলে পুরো পশ্চিমাবিশ্ব এক নিমেষে অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে বিমান চলাচল, থমকে দাঁড়াবে ইন্টারনেট, টেলিভিশন ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থা। আর্থিক লেনদেন স্তব্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক ব্যাংকব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সহজ কথায়, আজকের ডিজিটাল সভ্যতা। মুহূর্তের মধ্যে যেন সেই উনিশ শতকের আদিমতায় ফিরে যাবে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া 'কসমস ২৫৫৩' নামে একটি রহস্যময় উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, এতে পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান থাকতে পারে। তবে সূর্য এখন খুব বেশি সক্রিয় থাকায় এবং সৌরঝড় চলায় এর আসল তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে যে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় কণা তৈরি হবে, তা নিমেষেই পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানো শত শত উপগ্রহকে ধ্বংস বা অচল করে দেবে। আর তাতে পুরো কক্ষপথই চিরতরে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ধারণা, মহাকাশে একযোগে বিপুল পরিমাণ উপগ্রহ ধ্বংস করার চিন্তাভাবনা করছে মস্কো।
এছাড়া ২০২৫ সালে রাশিয়া যেসব উপগ্রহ পাঠিয়েছে, সেগুলো ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহগুলোর একদম পিছু ধাওয়া করার সময় ধরা পড়েছে। অন্যদিকে চীনের 'শেনলং' নামের চালকহীন স্পেস প্লেন মহাকাশে ঘুরে ঘুরে অন্য বস্তু বা উপগ্রহকে আঁকড়ে ধরে কবজা করার মহড়া চালাচ্ছে। এমনকি চীনের উপগ্রহগুলো অন্য উপগ্রহের মাত্র কয়েক ফুটের মধ্যে গিয়ে বিপজ্জনকভাবে যাতায়াত এবং মহাশূন্যে জ্বালানি বদলের মতো জটিল প্রযুক্তিও তৈরি করে ফেলেছে।
অন্যদিকে গত মাসেই মার্কিন স্পেস ফোর্স স্বীকার করেছে যে, তারা প্রথমবারের মতো মহাকাশে একটি প্রতিরক্ষা অস্ত্র মোতায়েন করেছে।
অ্যাস্ট্রোস্কেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিক শেভ জানান, ২০১৩ সালে যখন তারা এই প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন, তখন সামরিক কোনো চিন্তা তাদের মাথায় ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের 'স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স রিভিউ' বা সামরিক পর্যালোচনার পর তারা কৌশল বদলাতে বাধ্য হন। কারণ সেই বার্তায় স্পষ্ট বলা হয়েছিল, মহাকাশই হতে যাচ্ছে পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র। নিক শেভ বলেন, ‘গত ২০-৩০ বছর ধরে আমরা নিশ্চিন্তে উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছি, কখনো হামলার ভয় পাইনি। কিন্তু সেই দিন শেষ। এখন আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে এবং নিজেদের সম্পদ রক্ষা করার শক্তি দেখাতে হবে।’
মহাকাশে হামলা রোধে এখন নানা উদ্ভাবনী প্রযুক্তির কথা ভাবা হচ্ছে। মিসাইল বিভ্রান্ত করার উপায়ের মতো করে শত্রু উপগ্রহের নজরদারি বা আক্রমণ ভণ্ডুল করার সরঞ্জাম পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে। তবে নিক শেভ আশা প্রকাশ করেন, মানুষ যেন মহাকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার মতো কোনো ভয়াবহ ধ্বংসলীলায় মেতে না ওঠে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে গত সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স তাদের প্রথম বিশেষ 'স্পেস স্কোয়াড্রন' গঠন করেছে। স্পেস স্কোয়াড্রনের মূল কাজই হবে যুক্তরাজ্যের উপগ্রহগুলোকে রক্ষা করা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মহাকাশে শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর অপতৎপরতা অত্যন্ত দ্রুত ও জটিল আকার ধারণ করছে। এতে যেন ভূ-রাজনীতির মাঠের উত্তাপকেই ওপরের আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আজ বিশ্বজুড়ে পরাশক্তিগুলো তৈরি করছে লেজার, তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ, প্রতিপক্ষের উপগ্রহকে অন্ধ করে দেওয়ার যন্ত্র। কিংবা উপগ্রহকে কক্ষপথ থেকে টেনে হিঁচড়ে নিচে ফেলে দেওয়ার মতো ভয়ংকর সব মহাকাশ-অস্ত্র। পরীক্ষা করা হচ্ছে উপগ্রহ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও। 'অরবিট ফ্যাব'-এর প্রধান জ্যাকব গিয়াবের ভাষায়, ‘আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন সামরিক বিভাগের সাথে কোনো কথাই হতো না। কিন্তু এখন বিশ্ব বদলে গেছে। মহাকাশে নিজেদের আধিপত্য ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে বেসামরিক ও সামরিক—সব প্রযুক্তিকেই এখন এক সুতোয় গাঁথা হচ্ছে।’ এমনকি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সিও এখন তাদের বেসামরিক প্রকল্পগুলোতে সামরিক নিরাপত্তার নতুন চ্যাপ্টার যোগ করতে বাধ্য হচ্ছে।
অসীম আকাশ বরাবরই মানুষকে অজানাকে জানার ও শান্তির স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু সেই নির্জন অনন্ত নীলিমাই যদি আজ পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার দাপট ও যুদ্ধের আগুনের শিকার হয়, তবে তার খেসারত দিতে হবে সমগ্র মানবজাতিকে। পৃথিবীর যুদ্ধ যখন মহাকাশে ডানা মেলছে, তখন শান্তির সম্ভাবনাটুকু যেন আর অসীম শূন্যতায় হারিয়ে না যায়—আজকের দিনে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








