
গাজা ও ইরানে হত্যাকাণ্ডে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এআই ব্যবহার করেছে, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি ও গ্রেপ্তারে ব্যবহার করছে এই প্রযুক্তি। ভবিষ্যৎ যেন ইতোমধ্যেই এসে গেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে মতামত কলামে গ্রানাতে কিম ও মোহাম্মদ হুসেইন জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রযুক্তি ও নীতিনির্ধারণী অঙ্গনে এক অস্বাভাবিক ঐক্য তৈরি হয়েছে। স্যাম অল্টম্যান, ইলন মাস্ক ও ডেমিস হাসাবিসের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা দারিও আমোদেই, সত্য নাদেলা ও বিল গেটসের সাথে এআইয়ের বিপদ নিয়ে সতর্ক করেছেন। বছরের পর বছর প্রযুক্তিগত আধিপত্যের দৌড়ে ছুটলেও তারা এখন এআইয়ের উন্নয়ন কিছুটা ধীর করার আহ্বান জানাচ্ছেন। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও স্টিভ ব্যাননের সাথে জোট বেঁধে কংগ্রেসকে এআই নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের নানা প্রান্তের মার্কিন নাগরিকদের একত্র করেছে এমন বিষয় খুব বেশি নেই। এআই তার মধ্যে অন্যতম।
এখানে উল্লেখ্য, গ্রানাতে কিম ও মোহাম্মদ হুসেইন প্রযুক্তি জগতের বাইরের কোনো দূরবর্তী সমালোচক নন। কিম দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি, নজরদারি ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছেন এবং বর্তমানে এমপাওয়ার চেঞ্জের প্রচারাভিযান পরিচালক। আর হুসেইন মাইক্রোসফটের কর্মীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘নো অ্যাজুর ফর অ্যাপার্টহাইড’ আন্দোলনের সংগঠক এবং কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ ‘প্যালেস্টিনিয়ানস অ্যান্ড অ্যালাইস অ্যাট মাইক্রোসফট’ সংগঠনের নেতা। সংগঠনটি মানবাধিকারের সুরক্ষায় মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে। দুজনই মাইক্রোসফটের প্রযুক্তি ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে কাজ করছেন।
সাম্প্রতিক এই এআই বিরোধী তৎপরতার পেছনে আংশিকভাবে ভূমিকা রেখেছে এআই গবেষক জ্যাকব কক্সনের সতর্কবার্তা। টুইটার/এক্সে তিনি বলেছেন, এআই কোম্পানিগুলো 'আমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে'। তার মতে, এই প্রযুক্তি 'এই দশকের শেষ নাগাদ আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারে'।
কিন্তু এআই কীভাবে নজিরবিহীন মৃত্যু ও ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তা দেখার জন্য আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। কারণ এর প্রয়োগে কী ঘটতে পারে, তা আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি।
আগস্টের শেষ দিকে এআই এবং মানবতার ওপর এর সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে বিল গেটসের প্রায় ৬ হাজার শব্দের প্রবন্ধ তাই অবাক করার মতো কিছু নয়। আমাদের একজন প্রায় এক দশক ধরে মাইক্রোসফটে কাজ করছেন। এই সময়ে তিনি বাস্তব সময়ে এআইয়ের নানা বিপদ সামনে আসতে দেখেছেন। গত দুই বছর ধরে আমরা মাইক্রোসফটের কর্মী ও অধিকারকর্মীদের সাথে মিলে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় কোম্পানিটির ভূমিকা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আমরা সম্মিলিতভাবে মাইক্রোসফটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি।
তবে এআই-চালিত ধ্বংসযজ্ঞে জড়িত শুধু মাইক্রোসফট নয়।
গাজায় এআইয়ের যুদ্ধ-পরীক্ষা
ইসরাইলের গাজা যুদ্ধ এআইকে যুদ্ধের কাজে ব্যবহারের এক পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ফলাফল ছিল গভীরভাবে উদ্বেগজনক। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী হত্যার জন্য মানুষ শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করেছে। শুধু প্রথম মাসেই এআইয়ের মাধ্যমে ১২ হাজার লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে সেগুলোতে বোমা হামলা চালানো হয়। এ কাজে অর্থবহ মানবিক নজরদারি ছিল খুবই সামান্য, অথবা একেবারেই ছিল না। অস্কারজয়ী ইসরাইলি সাংবাদিক ইউভাল আব্রাহামের এক অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তার সর্বশেষ গার্ডিয়ান প্রযোজিত চলচ্চিত্র, নাজা,সেখানে ওই অভিযানে জড়িত ইসরাইলি সেনাদের সাক্ষ্য শিউরে ওঠার মতো ।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনী এআই-সম্পৃক্ত একটি বিমান হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের মিনাবে শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয় আক্রান্ত হয়। নিহত হন ১৫৬ শিশু, শিক্ষক ও অন্যান্য বেসামরিক মানুষ। যুদ্ধটিতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির প্রায় নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছিল ওই হামলায়। সম্ভবত ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করা একটি 'লক্ষ্য নির্ধারণের ভুলের' ফল ছিল হামলাটি।
এআইয়ের ভয়াবহতা বিদেশে থাকা মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোও এর প্রভাব ইতোমধ্যেই টের পাচ্ছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে নজরদারি, গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের কাজে মাইক্রোসফটের অ্যাজুরসহ এআইভিত্তিক বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করছে । দেশটিজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অথচ অ্যালগরিদমের পক্ষপাতের প্রমাণ রয়েছে, যার কারণে লাতিনো ও কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন নাগরিকদের ভুলভাবে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করার ঘটনা ঘটেছে।
নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগও মাইক্রোসফটের সাথে অংশীদার হয়ে ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সিস্টেম তৈরি করেছে। অ্যাজুর ব্যবহার করে এই ব্যবস্থায় ১৮ হাজার নিরাপত্তা ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে একটি ব্যাপক নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা পরে ব্রাজিল ও সিঙ্গাপুরসহ জর্জিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে, এআই চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যকেন্দ্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের এলাকাগুলোতে তৈরি করা হচ্ছে। এসব এলাকার অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। এখন এসব স্থাপনা থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণের কারণে তাদের বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
এসব ক্ষতির অনেকগুলোই বছরের পর বছর ধরে নথিবদ্ধ হয়েছে। তারপরও ডানপন্থী সরকারের নেতারা অসৎ ও কঠোর নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করে চলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইয়ের ঝুঁকিকে 'ভাঁওতা' বলে অভিহিত করেছেন। প্রযুক্তিটির ক্ষমতা সীমিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে তিনি 'অসুস্থ ষড়যন্ত্রের' অংশ বলেও মন্তব্য করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকানরা এআই নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে খারিজ করে দিয়ে তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিরোধিতার জন্য চীনা সরকারের অপতথ্যকে দায়ী করেছেন। ইসরাইলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার নাজা চলচ্চিত্রের নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সজরের নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনি 'রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার' অভিযোগ তুলেছেন।
একটি বিষয় পরিষ্কার, গেটস, আমোদেই এবং অন্যরা যে বিপজ্জনক ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক করছেন, সেটি ইতোমধ্যেই আমাদের সামনে। আরও ক্ষতি ঠেকাতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। গাজা, লেবানন, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের যেসব এলাকায় আইসিইর তৎপরতায় মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে, সেসব জায়গায় যাদের পরিবার আছে, তারা ইতোমধ্যেই এই দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস করা মানুষদের চেনে।
এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ
গত কয়েক সপ্তাহে এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ক্ষতি সীমিত করার চেষ্টা করছেন এমন মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কিছু উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ সম্প্রতি ফ্রন্টিয়ার অ্যাক্ট প্রস্তাব করেছে। এর আওতায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভেতরে তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারী নিয়োগ করে নিরাপত্তা যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে স্যান্ডার্স ও প্রতিনিধি গ্রেগ কাসার 'ব্যাক আর্টিফিশিয়াল সুপারইন্টেলিজেন্স অ্যাক্ট' উত্থাপন করেছেন। এর লক্ষ্য এমন প্রযুক্তি তৈরি ও উন্নয়ন থেকে প্রযুক্তি খাতের নেতাদের বিরত রাখা, যা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
এই বিলগুলো একটি শুরুর জায়গা হতে পারে। কিন্তু এগুলো পাস হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ততদিনে যে ধ্বংসযজ্ঞ ইতিমধ্যেই চলছে, তা থামানোর সমাধানও এসব বিলে নেই।
এআইয়ের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এবং সরকারগুলোকে এখনই সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণ, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থা এবং ব্যাপক নজরদারিতে এআই প্রযুক্তি বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই এবং গুগল ডিপমাইন্ডের কর্মীরাও এমন আহ্বান জানাচ্ছেন।
আমরা এমন এক মূল্যবান অথচ ক্ষণস্থায়ী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন এআই ইতিমধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের যে ক্ষতি করেছে, তা মোকাবিলা করার সুযোগ এখনো রয়েছে। আরও অনেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে অপরিবর্তনীয় হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের পথ সংশোধন করতে হবে।
এখনই এআইয়ের ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট সুরক্ষা-সীমা নির্ধারণ করতে হবে। এআইয়ের ভবিষ্যৎ এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তা শুধু সুবিধাভোগী অল্প কিছু মানুষের নয়, সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।








