
ফ্রান্স ও ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনের কিছু কিছু অংশ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে; দোকানপাটে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইতালিতে নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে—বিক্ষোভে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত সন্তানের জন্য এখন মা-বাবাকেও আর্থিক দায়ভার নিতে হবে। ফ্রান্সেও একই ধরনের প্রস্তাব বিবেচনা করছে সরকার।
আল জাজিরা শনিবার (২৪ অক্টোবর) জানায়, গত মাসে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হলে কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে । সেখানে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ মা-বাবারা সন্তানদের বিক্ষোভ থেকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিচ্ছেন। তবে দুই দেশের এই বিক্ষোভে মোট কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিক্ষোভের পটভূমি
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিসের উত্তরের শহরতলি সেইন-সাঁ-দেনিতে স্কুল ভবনের বেহাল দশা ও শিক্ষকসঙ্কটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সরকারি বাজেটে জনসেবার খাতে কয়েক মিলিয়ন ইউরো কাটছাঁটের পরিকল্পনা তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা স্কুল ঘিরে ব্যারিকেড তৈরি করেন, ফলে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেতন স্থগিত রাখার পরিকল্পনার প্রতিবাদে সরকারি খাতের কর্মীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, পেট্রলের সঙ্কট ও জ্বালানির দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় তা দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ পর্যন্ত গড়ায়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ গত সপ্তাহে বলেন, ‘কোনো কিছুই সহিংসতার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না।’ তিনি জানান, প্রয়োজন মনে হলে স্থানীয় কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কিছু জমায়েত নিষিদ্ধ করতে পারবেন। পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ কারফিউও ঘোষণা করে।
গত শনিবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ করেন। ইতালির মিলানে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে দাঙ্গায় রূপ নেয়। মূলত তরুণদের কয়েকটি দল দোকানে লুটপাট চালায়, জানালা ভাঙচুর করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। মুখোশধারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ও ফুটপাতের পাথর খুলে ছুড়ে মারেন। এমনকি পুলিশি ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বোলোনিয়া ও তুরিনেও দাঙ্গার খবর পাওয়া গেছে।
ইতালির নতুন ব্যবস্থা
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার অস্থিরতা মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ অনুমোদন করে। বছরের শেষ পর্যন্ত মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত সন্তানের মা-বাবার আর্থিক দায় বাড়ানো হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অন্তত পাঁচজনের দলে অংশ নিয়ে জননিরাপত্তা বিপন্ন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো (প্রায় ২২ হাজার ৪৬০ ডলার) জরিমানা হতে পারে। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের বিপজ্জনক বলে প্রমাণ পাওয়া গেলে অপরাধ না করলেও প্রশাসনিকভাবে আটক করা যাবে। আগে শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের এ ভাবে আটক রাখা যেত।
সরকারি ডিক্রিতে ‘ভাঙলে দাম দিতে হবে’ নীতির কথা উল্লেখ করে সন্তানের অপরাধমূলক কাজের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য মা-বাবার দায়বদ্ধতা জোরদার করা হয়েছে। ইতালির দেওয়ানি বিধির ২০৪৮ ধারায় বলা আছে, অভিভাবকের অধীনে থাকা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান যদি কোনো বেআইনি কাজ করে, তবে তার ক্ষতির দায়ভার নিতে হবে মা-বাবা বা অভিভাবকদের। পালক মা-বাবার ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য।
নতুন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র সরাসরি মা-বাবাকে জরিমানা করতে পারবে, তাঁদের সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে অথবা পরিবারকে দেওয়া সরকারি সহায়তা থেকে অর্থ কেটে নিতে পারবে। প্রয়োজনে সম্পদ বা মজুরি জব্দ করেও এই দায় আদায় করা সম্ভব।
ফ্রান্সের আইন ও প্রস্তাবনা
ফরাসি দেওয়ানি বিধির ১২৪২ ধারা অনুযায়ী, সন্তানের সঙ্গে বসবাস করেন এবং তার ওপর অভিভাবকের অধিকার প্রয়োগ করেন তবে এসব মা-বাবাকে সন্তানের সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য দেওয়ানি দায় বহন করতে হবে। আইন অনুযায়ী, মা-বাবা যৌথভাবে এই ক্ষতির দায় নেবেন। তবে আদালত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সন্তান যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকে, তবে মা-বাবার জন্য এই দায় বর্তাবে না।
গত বছর আইনের সংশোধনী এনে তরুণদের বিচারপ্রক্রিয়ায় মা-বাবার ভূমিকা আরও জোরদার করা হয়েছে। এখন থেকে দেওয়ানি দায়ের ক্ষেত্রে সন্তানের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাসের শর্তটি আর বাধ্যতামূলক নয়।
দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে মা-বাবার কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়। বিমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ না মিটলে তাঁদের সম্পদ জব্দ হতে পারে। সাধারণত বাড়ির বিমার সাথেই এই সুরক্ষা যুক্ত থাকে, তবে তা বিমার শর্তের ওপর নির্ভর করে।
ফরাসি রেডিও আরএফআই শুক্রবার জানায়, সহিংস বিক্ষোভের জবাবে সরকার ‘দাঙ্গাকারীরা ক্ষতিপূরণ দেবে’ নামে একটি বিল প্রস্তাব করেছে। ২৭ অক্টোবর বিলটি নিয়ে আলোচনার কথা রয়েছে। পাস হলে ভাঙচুরের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো (প্রায় ১১ হাজার ২০০ ডলার) ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্করা ক্ষতি করলে মা-বাবাও দায়ী হতে পারেন।
বিলে ‘দলগত দেওয়ানি দায়’ বা যৌথ দায়ের বিধানও থাকতে পারে। অর্থাৎ, কোনো দলের একজন সদস্য ক্ষতি করলে দলের অন্য সদস্যকেও একই আর্থিক শর্তে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু বলেন, করদাতারা যেন বিক্ষোভের ক্ষতির খরচ বহন না করেন, তা নিশ্চিত করতে এই আইনটি ‘একান্ত জরুরি’।
সুইডেনসহ আরও কিছু দেশে নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমার মধ্যে সন্তানের অপরাধে সৃষ্ট আঘাত বা সম্পত্তির ক্ষতির জন্য মা-বাবা কিংবা আইনগত অভিভাবকদের আর্থিক দায় নিতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে নিয়ম আলাদা হলেও সাধারণ বিধান হলো—কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি সম্পত্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা যানবাহন নষ্ট করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা স্থানীয় সরকার দেওয়ানি আদালতে মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








