
শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠেছে এসব বিক্ষোভ। বিলাসপণ্যের দোকানগুলোতে চলছে দেদারসে লুটপাট, পুলিশের সাথে পথে পথে সংঘর্ষের দৃশ্য এখন নিয়মিত। এসবের মধ্যে আন্দোলনকারীদের মুখে মুখে ফিরছে এক অন্যরকম স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।
এই স্লোগানটি আক্ষরিকভাবে খুব একটা অর্থবহ না হলেও শিক্ষার্থীরা এই বাক্যটিকে নিজেদের যাবতীয় ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছেন। মূলত ফরাসি পুলিশের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যঙ্গ ও উপহাস করতেই এ স্লোগানের জন্ম।
এই স্লোগানের অর্থ কী?
‘বিসমিল্লাহ’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। সাধারণত যে কোনো কাজ শুরুর আগে মুসলমানরা এটি বলে থাকেন। তবে ফরাসি কথ্য ভাষায় (স্ল্যাং) শব্দটি তার মূল ধর্মীয় ভাবার্থ খানিকটা হারিয়ে অনেকটা ‘চলুন শুরু করা যাক’ জাতীয় বাক্যে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে ‘সে লে তেনেব্র’ কথাটির আক্ষরিক অনুবাদ হলো—‘এটি আঁধার বা অন্ধকার’। এই বাক্যাংশ দিয়ে চরম হতাশাজনক বা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতিকে নির্দেশ করা হয়। সব মিলিয়ে স্লোগানটির আক্ষরিক দাঁড়ায়, ‘আল্লাহর নামে, চারপাশে অন্ধকার ছেয়ে গেছে’। এটি আলাদাভাবে সুস্পষ্ট কোনো বার্তা প্রকাশ করে না।
কিভাবে এলো এই স্লোগান?
শিক্ষার্থীদের মতে, ফরাসি পুলিশকে খোঁচা দিতেই এই বাক্যটির সৃষ্টি। বিক্ষোভ সমন্বয় করতে আন্দোলনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন চ্যাট গ্রুপ ব্যবহার করেন। অভিযোগ উঠেছে, এসব গ্রুপে ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছিল পুলিশ।
অক্টোবরের শুরুর দিকে ‘স্ন্যাপচ্যাট’-এর একটি স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ‘মামাদু’ নামে এক ব্যবহারকারী গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে লেখেন- ‘হাই, আল্লাহর নামে, চারপাশে অন্ধকার ছেয়ে গেছে। ভাই, ওয়াল্লাহ, অবরোধটা কবে?’ বার্তাটিতে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও ব্যবহার করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবি, আরবি ও স্থানীয় স্ল্যাংয়ের অসংলগ্ন সংমিশ্রণে তৈরি এই বার্তাটি মূলত ছদ্মবেশী কোনো পুলিশ কর্মকর্তা পাঠিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তাদের চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন তিনি। তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফরাসি কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এই স্লোগান আন্দোলন সম্পর্কে কী বার্তা দিচ্ছে?
এই স্লোগানটি এখন পুলিশি বর্ণবাদের প্রতি কটাক্ষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি তরুণদের জীবন থেকে ফ্রান্সের সরকার কতটা বিচ্ছিন্ন, সেটা বোঝাতেও এই স্লোগান বড় ভূমিকা রাখছে।
স্লোগানটি অবশ্য ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রতিবেশী ইতালি ও বেলজিয়ামেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেসব দেশেও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি ও শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছে।
একইসাথে ফ্রান্সে ‘ইসলামোফোবিয়া’ সংক্রান্ত আলোচনাও এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ফ্রান্সে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চায় না দেশটির সরকার। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় ২০২৫ সালের একই সময়ে এ ধরনের ঘটনা ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থীরা আন্দোলনে সহিংসতার জন্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই মুসলিম যুবকদের দায়ী করে বর্ণবাদী মন্তব্য প্রচার শুরু করে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, ফ্রান্সের আন্দোলন মূলত ‘মুসলমানদের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা’।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








