ইউক্রেনের পতাকা
ইউক্রেনের পতাকা। সংগৃহীত ছবি

শীত ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ইউক্রেনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে দেশটি। রাশিয়ার প্রায় প্রতিদিনের বিমান হামলায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে।

Advertisement

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত রোববার (১৮ অক্টোবর) বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পর থেকে এক সপ্তাহে রাশিয়া দেশটির বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে।

সোমবার তিনি জানান, রাতভর হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোর ১০টিরও বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এতে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

কিয়েভের দাবি, প্রথমে রাশিয়ার হামলার পাল্টা জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকলেও পরে ইউক্রেন আবারো রাশিয়ার বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে।

গত শীতেও রাশিয়ার হামলায় তীব্র ঠান্ডার মধ্যে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবারো প্রচণ্ড শীত আসন্ন হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎব্যবস্থা দ্রুত মেরামত করে সচল করতে কাজ করছে দেশটি।

চাহিদার ওপর চাপ কমাতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার কোনো সহজ সমাধান নেই।

বিশ্বব্যাংক গত ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, ইউক্রেনের জ্বালানি খাত পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৯১ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। শুধু চলতি বছরেই জরুরি মেরামতের জন্য দরকার প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।

তবে হামলা অব্যাহত থাকায় প্রকৃত ব্যয় আরো বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিক্সি গ্রুপের প্রধান ওলেনা পাভলেনকো বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা বিবেচনায় শুধু ২০২৬ সালেই ব্যয় ছয় থেকে সাত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আমি নিশ্চিত।’

কিয়েভের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে
বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, কিয়েভ শহরে তিনটি যৌথ তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র (সিএইচপি) রয়েছে। এসব কেন্দ্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট।

কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো চলতি মাসে বলেছেন, গত শীতের পর মেরামতের কাজ চালানো হলেও শহরের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কার্যত ‘ধ্বংস হয়ে গেছে’।

পাভলেনকো বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন সক্ষমতার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না। তবে তাদের ধারণা, তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর বেশিভাগই আবারো পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।

তিনি বলেন, বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা দিয়ে শহরের সম্পূর্ণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার আগে কেন্দ্রগুলো মেরামতের জন্য নগর কর্তৃপক্ষ ও সরকারের হাতে এখনো কিছুটা সময় রয়েছে। তবে নতুন করে হামলা হলে পরিস্থিতি আবারো আগের মতো হয়ে পড়বে।

কিয়েভের বড় বড় তাপ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর বেশিভাগই সোভিয়েত আমলে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত। ক্ষতিগ্রস্ত এসব কেন্দ্র মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের মজুতও কমে আসছে।

বিদ্যুৎ কোম্পানি ডিটিইকে জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে তাদের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ২৩০ বারের বেশি হামলা হয়েছে। গত ১ অক্টোবর এ তথ্য জানানো হয়।

ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান উক্রেনেরগোর কর্মকর্তা ভিতালি জাইচেঙ্কো গত সপ্তাহে বলেন, সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় জ্বালানি খাতের কর্মীদের কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, আগে রাশিয়া উচ্চ ভোল্টেজের সাবস্টেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করত। এখন তারা সরাসরি উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনেও হামলা চালাচ্ছে।

বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা দ্রুত গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্কও হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

এছাড়া দিন-রাত চলতে থাকা বিমান হামলার সতর্ক সংকেতের কারণে মেরামতকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এসব সতর্ক সংকেত কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বাস কিয়েভে। শীত মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে মেয়র ক্লিচকোর কাজের গতি প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।

তবে মেয়র জানিয়েছেন, বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হবে। এ জন্য স্কুল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে আলো, তাপ ও গরম পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর জোর
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর আগে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৮ গিগাওয়াট।

প্রায় পাঁচ বছরের যুদ্ধে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে বর্তমানে ঠিক কতটুকু উৎপাদন সক্ষমতা অবশিষ্ট রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

বর্তমানে ইউক্রেনের সচল তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫৫ শতাংশের বেশি সরবরাহ করছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ গ্রিড এবং একই ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনের মতো বিকল্প পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ইউক্রেনের হাতে সময় খুবই কম।

বিদ্যুৎ সরবরাহে অস্থিতিশীলতার কারণে এরই মধ্যে কিয়েভের মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এবার পানি সরবরাহও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কিয়েভের প্রধান পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিয়েভভোদোকানালের উপপ্রধান নির্বাহী সের্হি গোরকুতসেঙ্কো বলেন, ‘শহরে বিদ্যুৎ না থাকলে পানিও থাকবে না।’

সম্প্রতি ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম ইপ্রাভদাকে দেয়া বক্তব্যে তিনি জানান, পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা কিংবা জরুরি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পানি পাম্প করার সক্ষমতা কমে যাবে। এতে বহুতল আবাসিক ভবনগুলোতে পানি সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে।

ইতোমধ্যেই কিয়েভের বাসিন্দারা কল থেকে পানি না পাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। পানি সরবরাহের পাশাপাশি পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এতে জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গোরকুতসেঙ্কো সতর্ক করে বলেন, ‘পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে তিন দিনের মধ্যে মহামারিগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।’

সূত্র : বাসস