ইউক্রেনের পতাকা
ইউক্রেনের পতাকা। সংগৃহীত ছবি

রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম সতর্ক না করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত স্টারলিংক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে ইউক্রেনের সামরিক পাল্টা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার অভিযোগ তুলেছে ইউক্রেন।

Advertisement

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের ধনকুব ইলন মাস্ককে স্টারলিংক ব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। কিয়েভের দাবি, এ ব্যবস্থার গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। 

ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি আশা করি, এটি কোনো ভুল কিংবা বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা। আমি জানি না। তবে আমরা এটি চালু করে দিতে অনুরোধ করছি।’

পরে ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ বলেন, ‘ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে স্টারলিংকের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হচ্ছে। এর ফলে আঘাত হানার কাজে ব্যবহৃত ড্রোন ও প্রতিরোধী ড্রোনগুলো আবার উড়তে পারবে।’

মাস্ক বলেন, স্টারলিংক ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটে থাকলে তার দায় তার প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের।

তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য ইউক্রেনের ব্যবহৃত স্টারশিল্ড ব্যবস্থা এবং এর পাশাপাশি থাকা বেসামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা স্টারলিংকের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরেন। ইউক্রেন স্টারলিংকও ব্যবহার করে। তবে আক্রমণাত্মক অভিযানে এ ব্যবস্থা ব্যবহারের অনুমতি তাদের নেই।

মাস্ক বলেন, ‘স্টারশিল্ড ব্যবস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে। এর গতি বা ব্যবহারসংক্রান্ত যেকোনো সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।’

এ ক্ষেত্রে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা উল্লেখ করেন।

কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা মস্কোর সাথে ট্রাম্প ডিজেল সরবরাহ চুক্তির ঘোষণা দেয়ার পর তিনি নিজেকে ‘বিশ্বাসঘাতকতার শিকার’ মনে করছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি সম্মতিসূচক উত্তর দেন।

তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আমাদের পক্ষ না নিয়ে অন্য পক্ষ বেছে নেন, তখন তা বেদনাদায়ক। আমার মনে হয়, তার উপদেষ্টারা ভুল করছেন। কে তাকে সঠিক পক্ষ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন, তা আমি জানি না। ইতিহাসের সঠিক পক্ষ এটি নয়।’

মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার ভোরে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে মিত্র দেশগুলো সতর্ক না করায় জেলেনস্কি এর আগে একে ‘সম্পূর্ণ অন্যায়’ বলে অভিহিত করেন। একইসাথে তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প একতরফাভাবে যে কথিত ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করেছিলেন, রাশিয়া তা ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করছে।

কিয়েভের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। ইউক্রেন এসব তথ্য ব্যবহার করে হামলা প্রতিহত করে থাকে। তবে ট্রাম্প মঙ্গলবার এমন হুমকি দেয়ার কথা অস্বীকার করেন।

প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারাও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইন্টারনেটের কয়েকটি টার্মিনালের গতি কমে যাওয়ার পেছনে ওয়াশিংটনের ভূমিকা থাকতে পারে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী এসব টার্মিনাল ব্যবহার করে রুশ-অধিকৃত ভূখণ্ডে হামলা চালায় এবং প্রতিরোধী ড্রোন পরিচালনা করে।

কিয়েভের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো না কোনো কারণে রাশিয়াকে সহায়তা করছে।’

জেলেনস্কির উপদেষ্টা সের্গি বেস্ক্রেস্তনভ বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও স্টারলিংক ব্যবস্থায় বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা নিছক কাকতালীয় নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, ‘তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের অংশীদাররা জেট ইঞ্জিনচালিত শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষার যে অল্প কয়েকটি সুযোগ আমাদের রয়েছে, তার একটি থেকে আমাদের বঞ্চিত করছে।’

ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
মস্কোয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, রাশিয়া তা পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এসব বিষয় সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করছি। তবে এ মুহূর্তে সামগ্রিক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।’

এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল সরবরাহের প্রথম চুক্তিগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত হবে।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মার্কিন পক্ষের সাথে প্রতি ঘণ্টায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি। সবকিছুই খুব দ্রুত এগোচ্ছে।’

আগামী মাসে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলাকে জ্বালানি সরবরাহে সঙ্কট ও পাম্পে জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য দায়ী করেছেন।

তবে বেশিভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, এর প্রকৃত কারণ হলো ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা। এসব হামলার পর তেহরান তেল ও গ্যাস পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে।

‘অসম্মান’
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে টানা দুই রাত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। হামলার আগে মানুষকে বেজমেন্ট, বোমা আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা মেট্রোস্টেশনে আশ্রয় নেয়ার সতর্কবার্তা দিতে বিমান হামলার সাইরেন সময়মতো বাজেনি।

জেলেনস্কি বলেন, ‘রাশিয়া এর আগে কখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এতটা প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য দেখায়নি।’ 

শত্রুতা প্রশমনের একটি সুযোগ মস্কো নষ্ট করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

চলমান সংঘাতে আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ার ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। এর আগে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলেন, রুশ সামরিক বাহিনীর শনাক্ত করা কঠিন এমন ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার কিংবা সম্ভাব্য কারিগরি সমস্যার কারণে এমনটি ঘটে থাকতে পারে।

সর্বশেষ দফার হামলায় ইউক্রেনজুড়ে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। জ্বালানি স্থাপনা ও সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে কিয়েভের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ঝিতোমির, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুমি এবং উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভেও হামলা হয়েছে।

এর আগেও রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তাপ সরবরাহ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। এতে শীতের আগে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শীতকালে দেশটিতে তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে।

সূত্র : বাসস