
‘আমরা অপেক্ষা করছি, অপেক্ষা করেই চলেছি। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে।’ আক্ষেপের সাথে কথাগুলো বলছিলেন সিরীয় বংশোদ্ভূত কারিগরি পেশাজীবী আহমেদ আলবোকি। ডেনমার্কের নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার কারণে তার সেই পথ ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
ডেনমার্কে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া বেশ কঠোর। দেশটির নাগরিকত্ব পেতে গড়ে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। তবে এ বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া এবং নতুন নাগরিকদের নাগরিকত্বের আবেদন সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করার বাধ্যবাধকতার কারণে আলবোকির আবেদন আটকে গেছে।
নাগরিকত্বের আবেদনের যোগ্যতা অর্জন করতে তাকে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী চাকরি, স্থায়ী বসবাসের অনুমতিপত্র, অপরাধের রেকর্ড না থাকা এবং ডেনিশ ভাষা ও দেশটির সাধারণ জ্ঞানবিষয়ক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।
ডেনমার্কের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করার পর ২০২৩ সালের জুনে অবশেষে নিজের ও তিন সন্তানের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে সক্ষম হন তিনি।
বছরে দু’বার যাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে, তাদের নামের তালিকাসহ একটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে সেটি নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্থাপনের জন্য নির্ধারিত একটি বিলে আলবোকির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
বার্তাসংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘ডেনমার্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় বিষয়টি পিছিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নেয়া হয়। ২০২৬ সালে সংসদে বিলটির প্রথম পাঠ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করায় বিষয়টি বাদ পড়ে যায়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওই সংসদ নির্বাচনের কারণে আমার জীবন যেন থমকে গেছে।’
দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক
কঠোর নাগরিকত্ব নীতির পক্ষে অবস্থান নেয়া সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন ডেনমার্ক সরকার এখন নাগরিকত্বের সব আবেদন নতুন করে পর্যালোচনার পর ২০২৭ সালে একটি নতুন বিল সংসদে উত্থাপনের কথা বিবেচনা করছে।
আলবোকির মতো দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নাগরিকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। এ সংখ্যার মধ্যে তাদের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এমনই একজন সান্দ্রা ফ্রেডেরিকসেন এএফপিকে বলেন, ‘আমি খুবই হতাশ। আমার মনে হয়, আমাকে এখানে স্বাগত জানানো হচ্ছে না। মনে হয়, আমি যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।’
আলবোকির বড় মেয়ে জুলির জন্য সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
১৭ বছর বয়সি জুলি বলেন, বাবা যখন প্রথমবার তার নাগরিকত্বের আবেদন জমা দেন, তখন বয়স ছিল ১৪ বছর। এখন তার বয়স ১৭।
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বাবার মাধ্যমে ডেনমার্কের নাগরিকত্ব না পেলে তাকে নিজেকেই নতুন করে আবেদন করতে হবে।
কিশোরী জুলি বলেন, ‘যখন আমাকে নিজে ডেনমার্কের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে, তখন হয়তো নতুন নিয়ম ও নতুন শর্ত চালু হবে। এতে নাগরিকত্ব পাওয়া আমার জন্য আরো কঠিন হয়ে যেতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আবার যেতে হবে—এই চিন্তাটাই খুব চাপের। তার ওপর সবকিছু একা সামলাতে হবে।’
জুলি বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রথম বর্ষে পড়ছে। পড়াশোনা শেষে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার ইচ্ছা তার।
তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল ডেনমার্কেই চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা। কিন্তু এখন সেই স্বপ্ন হয়তো আর পূরণ হবে না।’
‘অযৌক্তিক ও দুর্বিষহ’ নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া
বামপন্থী সংসদ সদস্য পেদার হভেলপ্লুন্ড নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা কমানোর পক্ষে। তার মতে, এই বিলম্বের কারণে শত শত শিশুর জীবনে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে, যারা বাবা-মায়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার আশা করেছিল।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এখন তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য অত্যন্ত দীর্ঘ এবং দুর্বিষহ এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’
হভেলপ্লুন্ডের দল রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স সরকারকে সমর্থন করলেও নাগরিকত্ব দেয়ার প্রক্রিয়ায় সংস্কার চায়।
তিনি বলেন, নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়টি সংসদীয় ভোটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রত্যেক আবেদনকারীকে রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়তে হতে পারে। এতে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার ভিত্তিতে আবেদনকারীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ তৈরি হয়।
হভেলপ্লুন্ড আরো বলেন, ‘যারা নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের অপরাধী হিসেবে তুলে ধরতে চান, এই ব্যবস্থা তাদের বিচ্ছিন্ন কোনো একটি ঘটনা সামনে এনে বলার সুযোগ করে দেয়—এদের একজন অপরাধ করেছে। তার মানে, ওরা সবাই এমন!’
ডেনমার্ক সরকার এখন নাগরিকত্বপ্রত্যাশীরা দেশটির নির্দিষ্ট মূল্যবোধ ধারণ করেন কি না, তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাই চালুর পরিকল্পনা করছে। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি বিল উত্থাপনের কথা রয়েছে।
সম্প্রতি দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ডেনমার্কের নাগরিকত্ব বিদেশীরা যে সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলোর একটি পেতে পারেন, তার মধ্যে অন্যতম।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘শুধু তাদেরই নাগরিকত্ব দেয়া উচিত, যারা ডেনমার্কের প্রতি অনুগত এবং যাদের মূল্যবোধ ডেনমার্কের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








