
২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যার বিনোদন বিভাগে ‘সাক্ষাৎকার প্রতিদিন’ কলামে কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতুল্লাহর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। ধ্রুপদী নাচের এই উজ্জ্বল তারকার সাক্ষাৎকার নেন সাজেদ ফাতেমী। যেখানে গল্পে গল্পে উঠে আসে—কিংবদন্তি নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতুল্লাহ চার বছর বয়স থেকে দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছর ধরে ধ্রুপদী ও লোকনৃত্য পরিবেশন করে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব সত্ত্বেও নাচের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি এই শিল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন।
আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—
‘এদেশে নাচ দেখার অনেক ভালো দর্শক আছে’
মাত্র চার বছর বয়সে মঞ্চে নেচে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে টানা পয়তাল্লিশ বছর নাচছেন। তিনি আর কেউ নন। এদেশের কিংবদন্তীতুল্য নৃত্যশিল্পী জিনাত বরকতুল্লাহ। আপন মহিমায় আজও উজ্জ্বল। ধ্রুপদী নাচের এই উজ্জ্বল তারকার সঙ্গে কথা বলেছেন সাজেদ ফাতেমী
প্রথমে নিজের সম্পর্কে বলুন
— আমার জন্ম ১৯৫১ সালে ঢাকার ধানমণ্ডিত। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেছি। বর্তমানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর প্রযোজনা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছি।
নাচের সাথে সম্পর্ক কত দিনের
— সেই ১৯৫৬ সাল থেকে। চার বছর বয়সে চাচাতো বোনের জন্মদিনের প্রোগ্রামে প্রথম নাচি। তখন আমার নাচ দেখে সবাই আমাকে খুব আদর করেছিল। আজও স্পষ্ট মনে আছে।
নাচ শেখা শুরু করেন কবে—
— ৬-৭ বছর বয়সে। আমার বাবা এসডিও ছিলেন। তখন আমরা জামালপুরে থাকতাম। ওই সময় সেখানকার সব প্রোগ্রামেই আমাকে নাচতে ডাকা হতো। দশবছর বয়স পর্যন্ত জামালপুরে থাকার সুবাদে তখন থেকেই নৃত্যশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পাই।
আপনার সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী—
— লুবনা মরিয়ম, কাজল ইব্রাহিম, পিনু খানসহ আরও বেশ ক’জন ছিলেন। তাদের কেউই এখন নাচের সঙ্গে নেই।
কোন ধরনের নাচে বিশেষ দক্ষতা—
— আমাদের সময়ে সমাজে বিশেষ কোনো নাচে দক্ষতার বিষয়টি ছিল না। ভারত নাট্যম, মনিপুরী, কথক—সব ধরনের নাচই শিখেছি। তবে নাচে হাতেখড়ি হয় কথক নাচ দিয়ে। পরে লোকনৃত্যে বেশ নাম করেছিলাম। বিদেশেও লোকনৃত্যের কদর বেশি।
নাচের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ—
— তা তো আছেই। আমি ১৯৭০ সালে বুলবুল ললিতকলা একাডেমী থেকে নাচের ওপর ছয় বছরের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেছি। তাতে প্রথম হয়েছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে প্রয়াত জিএ মান্নান সাহেব, বাবু রাম সিং, বেগম রাহিঁজা খানম, ঝুনু ও দুলাল তালুকদারের কাছে নাচ শিখেছি। দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও ব্যালে নৃত্যের ওপর ছয় মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছি।
নাচে প্রথম দিকের জুটি—
— জুটি হিসেবে প্রথম নেমেছি জিএ মান্নান সাহেবের সঙ্গে। উনি বয়সে আমার অনেক বড় হলেও মানিয়ে যেত। পরে মঈদুল ইসলাম, হাসান ইমাম এবং সর্বশেষ শফিকুর রহমানের সঙ্গে নেচেছি। এখনো বিদেশ ট্যুরগুলোতে শফিকের সঙ্গে নাচা হয়।
প্রথম টিভি প্রোগ্রাম—
— টেলিভিশনের জন্মের পর থেকেই প্রোগ্রাম করেছি। তবে টিভিতে নিয়মিত প্রোগ্রাম করেছি ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত।
কোন কোন নৃত্যনাট্যে অংশ নিয়েছেন
— ১৯৬৩ সালে রবীন্দ্রনাথের শ্যমাতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে। তারপর চিত্রাঙ্গদা, রাজপথ জনপথ, হাজার তারের বীনা, সূর্যতোরণ, বাদল বরিষণে, অরুণাচলের পথে, কাজরী, নকশী কাঁথার মাঠ, মহুয়া, শাহজাহানের স্বপ্ন ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ত্রিশটি নৃত্যনাট্যে অংশ নিয়েছি।
এদেশের মানুষ টিকেটে কেটে গান শোনে, নাটক দেখে। কিন্তু নাচের ব্যাপারে তেমনটি হতে দেখা যায় না কেন?
— হ্যাঁ, নাচটাকে এখনো এদেশের মানুষ সেভাবে গণবিনোদনের বিষয় বলে হয়তো মনে করছে না। বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি। একে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য আমি অনেক চেষ্টা করেছি। এদেশে টিকেট কেটে নাচ দেখার অনেক ভালো দর্শক আছে। কিন্তু উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগের অভাবে এটা করা যাচ্ছে না।
নাচতে নাচতে কয়টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।
— অনেক। অন্তত পঁচিশটি দেশ তো হবেই। তার মধ্যে মালয়েশিয়া গিয়েছি চারবার, হংকং চারবার, দক্ষিণ কোরিয়া দুই বার, আমেরিকা, জার্মানি, তুরস্কসহ ইউরোপের অনেক দেশে গিয়েছি।
নাচ নিয়ে পরিকল্পনা—
— অনেক কিছু ভাবি। করার ইচ্ছেও আছে। তবে তা আগেই জানিয়ে লাভ কী?
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








