দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যা
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যা। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর নয়া দিগন্তের প্রথম সংখ্যায় ইকবাল করিম নিশানের লেখা ‘বেসামাল সেন্সরের কারণে ধ্বংসের মুখে ঢাকার চলচ্চিত্র’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব, সেন্সর বোর্ডের উদাসীনতা এবং কুরুচিপূর্ণ ও অপসংস্কৃতির অবাধ প্রবেশের কারণে বাংলাদেশের দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প ও সিনেমা হলের পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচাতে অনতিবিলম্বে সঠিক সেন্সর নীতিমালা প্রণয়ন, অশ্লীলতা রোধ এবং সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

Advertisement

আজ নয়া দিগন্তের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

বেসামাল সেন্সরের কারণে ধ্বংসের মুখে ঢাকার চলচ্চিত্র
ইকবাল করিম নিশান

একদিকে সেন্সরশিপের নামে অন্ধ ও ভারসাম্যহীন নীতি অন্য দিকে একের পর এক বিদেশি চলচ্চিত্রের হিন্দি সংস্করণের অবাধ প্রবেশ—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প। ইতিহাসকে মুছে ফেলার যে ঘৃণ্য অপচেষ্টা, অপসংস্কৃতির প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প, দেশীয় ঐতিহ্য, ভাষা, ইতিহাস। এক সময় যে চলচ্চিত্রের গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরত, সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। আমাদের বাংলা সিনেমার বর্তমান করুণ অবস্থা ঢাকাই সিনেমার ভবিষ্যতকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে সেন্সর বোর্ডের কোনো মাথাব্যথাই নেই। তাদের সেন্সর পলিসি বা নীতির অভাব আর দায়িত্বহীন কাজের জন্য আজকে দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি।

আমরা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প বা সেন্সরশিপ নিয়ে কথা বললে সেখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। চলচ্চিত্র কেবল বিনোদন নাকি তার চেয়ে বড় কিছু? আজ ২৫ বছর পার হলেও কোন স্পষ্ট উত্তর বা দিকনির্দেশনা আমরা খুঁজে পাই না। বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড আজও পর্যন্ত একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি। ফলে আজ যে কুরুচিপূর্ণ ও কুরুচিসম্পন্ন ছবিগুলো মুক্তি পাচ্ছে, তা দেশের সাধারণ মানুষের রুচি ও বিশ্বাসের ওপর চরম আঘাত হানছে। সিনেমা হলগুলো আজ অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এতে করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই।

সূত্রে জানা গেছে, চলচ্চিত্রের স্বাধীনতা বলতে যদি ব্যাকডোর ও কাটপিস ছবি নির্মাণ বোঝায়, তবে দেশের ঐতিহ্য রক্ষা করবে কে? আমাদের চলচ্চিত্র পরিচালক বা প্রডিউসারদের মনোভাব এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কাটপিস বা অশ্লীল ছবি বানিয়ে টাকা উপার্জনই যেন প্রধান উদ্দেশ্য। তাদের মতে, ভালো ছবি বানিয়ে দর্শক পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এসব দাবি কতটা সত্যি বা অসত্য, তা এখন আলোচনার বিষয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন একাধিকবার কাটপিস বা কুরুচিপূর্ণ ছবির বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তারা সিনেমা হলের সামনে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেছেন এবং সেন্সর বোর্ডের কার্যকর ভূমিকা ও সুষ্ঠু সেন্সর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সেন্সর বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এ ব্যাপারে বরাবরের মতোই উদাসীন ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বর্তমানে সিনেমা ব্যবসায়ীদের অবস্থা চরম সংকটাপন্ন। দর্শক সংকট, সিনেমা হলের পরিবেশ নষ্ট হওয়া, সরকারি সহায়তার অভাব এবং অশ্লীল ছবির দৌরাত্ম্যে ভালো ভালো সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রযোজক-পরিচালকরাও এখন আর ঝুঁকি নিয়ে বড় বাজেটের মানসম্মত ছবি বানাতে সাহস পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনতিবিলম্বে সঠিক সেন্সর নীতিমালা প্রণয়ন, কাটপিস ও অশ্লীল ছবি তৈরি নিষিদ্ধ করা, সিনেমা হলের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।