বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক
বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক। সংগৃহীত

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব বাড়াতে চায় অস্ট্রেলিয়া। এ লক্ষ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ বিনিয়োগ এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।

Advertisement

সোমবার (২৬ অক্টোবর) ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে ‘অস্ট্রেলিয়ান ক্লিন এনার্জি কো-অপারেশন’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কর্মকর্তা ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা এসব সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

সেমিনারে অস্ট্রেলিয়া সরকারের প্রতিনিধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

সেমিনারে অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পোবকে বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই উপায়ে পূরণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫-কে স্বাগত জানান। এ নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

পোবকে বলেন, বাংলাদেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় পাঁচ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাজারে অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, নেট মিটারিং, ব্যাটারি সংরক্ষণ, বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামো এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

এ ছাড়া চা-বাগানের অব্যবহৃত জমিতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি রূপান্তরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পোবকে বলেন, বিদ্যুৎ গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযোগ, ব্যবস্থার নিরাপত্তা, বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

তবে বাংলাদেশের স্থানীয় পরিস্থিতি ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পোবকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির সাথে বাংলাদেশের স্থানীয় জ্ঞান, সক্ষমতা ও অগ্রাধিকারকে সমন্বয় করার মধ্যেই প্রকৃত সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।’

অস্ট্রেলিয়ান ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কমিশনের (অস্ট্রেড) জ্যেষ্ঠ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশনার জোডি ম্যাকে বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তরের ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতার ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োমাস জ্বালানির বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। 

তিনি বলেন, অস্ট্রেলীয় প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্য শুধু প্রযুক্তি তুলে ধরা নয়; বরং স্থানীয় বাজার সম্পর্কে ধারণা নেয়া, সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে বের করা এবং বাণিজ্যিক সুযোগ যাচাই করাও এর লক্ষ্য।

সেমিনারে অংশ নেয়া অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলোর সৌর ফটোভোল্টাইক ব্যবস্থা, ব্যাটারি প্রযুক্তি, প্রকৌশল, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি মডেলিং, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সম্ভাব্য সহযোগিতা শুধু যন্ত্রপাতি রফতানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও সংযোজন, প্রকৌশল সেবা এবং গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক উপস্থিতি বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এবিসিসিআই) সভাপতি এম মাকসুদ দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি প্রচলিত ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির যৌথ উৎপাদন ও সংযোজন, প্রকৌশল ও পরামর্শক সেবা, গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী সবুজ অর্থায়ন দুই দেশের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।

এ ধরনের অংশীদারত্ব বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বাজারে অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলোর প্রবেশের সুযোগ তৈরি করবে। একইসাথে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়বে এবং দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সেমিনারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, মাইক্রোগ্রিড এবং বুদ্ধিমান জ্বালানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়।

বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতকেও দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিশেষ করে চার্জিং নেটওয়ার্ক, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহন সংযোজনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাউন্সিলের (আরইসিএপি) প্রধান নির্বাহী জন গ্রিমস বাংলাদেশের বাজারে অস্ট্রেলীয় কোম্পানিগুলোকে সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শিল্পের সামগ্রিক বিকাশে সহায়ক সুযোগ তৈরিতে কোম্পানিগুলোকে একসাথে কাজ করতে উৎসাহিত করেন।

অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি দুই দেশের ব্যবসায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগ সহজ করতে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

সেমিনারের আলোচনায় প্রযুক্তি হস্তান্তর, বেসরকারি বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের স্থানীয় চাহিদার উপযোগী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সমাধানের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি রূপান্তরে অস্ট্রেলিয়ার আরো বড় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা উঠে আসে। বাসস