
মেয়েঘটিত বিরোধের জেরে রাজধানী ঢাকায় এক তরুণকে হত্যার পর লাশ ট্রাঙ্কে ভরে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে নীলফামারীর ডিমলায় নিজ বসতভিটায় এনে পুঁতে রাখার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গোপন রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি। নিহত তরুণকে জীবিত দেখিয়ে তৈরি করা ভিডিও তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দাবি করা হয় চার লাখ টাকা মুক্তিপণ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের বসুনিয়াপাড়া এলাকায় অভিযুক্তের বসতভিটার উঠান খুঁড়ে নিহত তরুণের গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিহত তরুণের নাম রাকিব ইসলাম। তিনি টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার খাদেমুল ইসলামের ছেলে। এ ঘটনায় মামুন (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি ডিমলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আফসার আলীর ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাকিব রাজধানীর মিরপুর-১০ সংলগ্ন কাফরুল থানার উত্তর শেওড়াপাড়া এলাকায় থেকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির কোচিং করছিলেন। একই এলাকায় থাকার সুবাদে মামুনের সাথে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। সম্প্রতি এক তরুণীকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় রাকিবকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর লাশ গুম করতে রাকিবের লাশ একটি বড় বাক্সে (ট্রাঙ্ক) রাখা হয়। হত্যার দুই দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর, দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় পরিবহনে করে ওই ট্রাঙ্ক নীলফামারীর ডিমলায় নিজের বাড়িতে নিয়ে যান মামুন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, ট্রাঙ্ক থেকে দুর্গন্ধ বের হলে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা এ বিষয়ে জানতে চান। তখন মামুন জানান, তিনি ঢাকা থেকে পচা বা শুঁটকি মাছ নিয়ে এসেছেন। পরে ওই রাতেই বসতভিটার এক কোণে গর্ত খুঁড়ে ট্রাঙ্কসহ লাশটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
এরপর রাকিবের পরিবারকে বিভ্রান্ত করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। পুলিশ জানায়, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় রাকিবের আগের ছবি ও কণ্ঠ ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম ভিডিও তৈরি করা হয়। ভিডিওতে রাকিবকে জীবিত এবং অপহরণকারীদের হাতে আটক অবস্থায় দেখানো হয়। পরে ওই ভিডিও রাকিবের বাবার মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
নিহত রাকিবের স্বজনেরা জানান, ১৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এর মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও বার্তা পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে বিষয়টি জানিয়ে কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ বিভাগের সহায়তায় প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে ওই ভিডিও বার্তার উৎস এবং মামুনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে কাফরুল থানা-পুলিশের একটি দল ডিমলায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুন রাকিবকে হত্যার কথা জানান এবং তার লাশ ডিমলায় নিজের বাড়িতে পুঁতে রাখার তথ্য দেন।
তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দুপুরে কাফরুল ও ডিমলা থানা-পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তের বাড়ির উঠান থেকে মাটির নিচে পুঁতে রাখা লাশটি উদ্ধার করে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: আশরাফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে আসামি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। ঢাকা থেকে ট্রাঙ্কে করে লাশ গ্রামে এনে পচা মাছের কথা বলে নিজের উঠানে পুঁতে রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ব্যবহারের বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।’
পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মূল ঘটনাস্থল ঢাকা হওয়ায় এ ঘটনায় রাজধানীর কাফরুল থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








