শিশু নিখোঁজ হলে জরুরি ভিত্তিতে ৯৯৯, থানা ও মুন অ্যালার্টের হটলাইনে যোগাযোগ, বিস্তারিত তথ্যসহ জিডি এবং আশপাশে দ্রুত সন্ধান চালানো উচিত।
নিখোঁজ হওয়ার আগে শিশুটির মানসিক চাপ বা ভয় ছিল কি না সেব্যাপারেও জানাতে হবে সংগৃহীত

শিশু নিখোঁজ হলে বা হারিয়ে গেলে কী করা উচিত- এই প্রসঙ্গটি দেশে সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছে; বিশেষ করে কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর।

পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারাদেশে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ হয়, যাদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি শিশুর সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। এই তথ্য জানানো হয়েছিল চলতি মাসের শুরুতে।

আবার বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, বছরের শুরু থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত ৩৬টি নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিমের নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধারের ঘটনা সারাদেশে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। ওই ঘটনায় অপ্রতিমেরই পূর্ব-পরিচিত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান নিয়ে কাজ করা প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রতিষ্ঠান জিরো মিসিং ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট সাদাত রহমান বলছেন, নিখোঁজের পর প্রথম তিন ঘণ্টায় অনেকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে থাকে এবং সে কারণে ওই সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডকে শিশুটির উদ্ধারের জন্য কাজে লাগাতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, বাচ্চা নিখোঁজ হলে সাথে সাথে জরুরি নম্বরে কল দিয়ে কিংবা স্থানীয় থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাতে হবে এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী যত বেশি সম্ভব তথ্য দিয়ে দ্রুততার সাথে জিডি করতে হবে।

পুলিশের একজন মুখপাত্রও একই পরামর্শ দিয়েছেন।

শিশু হারালে কী করবেন
জামালপুরের মাদারগঞ্জে গত ১০ সেপ্টেম্বর সাত বছরের একটি শিশু স্কুলে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। পরে ওই শিশুর লাশ তারই এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় পায় পুলিশ।

এরপর সংবাদ সম্মেলন করে সেখানকার পুলিশ জানায়, ওই শিশুর সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন।

আবার গত ১৬ সেপ্টেম্বর পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নে নিখোঁজের সাত দিন পর ১০ বছর বয়সের এক শিশুর টুকরো করা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

আবার খুলনার ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ভারত থেকে উদ্ধারের ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল; ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই ওই কিশোরীটিকে মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার নাইগাঁও থেকে উদ্ধারের পর ওই শিশু তার উপর হওয়া নিপীড়নের মর্মস্পর্শী বিবরণ দিয়েছিল।

নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে জিরো মিসিং ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট সাদাত রহমান বলছেন, শিশু হারালে বা নিখোঁজ হলে দ্রুততম সময়েই কিছু পদক্ষেপ নিলে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুটিকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

জিরো মিসিং ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম মুন অ্যালার্ট নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান নিয়ে কাজ করে। এটি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সামাজিক মাধ্যম ও বিলবোর্ডে নিখোঁজ শিশুর বিস্তারিত তথ্য দিয়ে অ্যালার্ট দিয়ে থাকে।

সাদাত রহমান বলছেন, এফবিআইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজের পর প্রথম তিন ঘণ্টায় অনেক শিশু হত্যার শিকার হয় এবং সে কারণে ওই সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড শিশুটিকে খুঁজে পেতে কাজে লাগাতে হবে।

‘গোল্ডেন আওয়ার’ কাজে লাগানো
সাদাত রহমানের মতে, ওই তিন ঘণ্টাই গোল্ডেন আওয়ার, যার প্রতিটি মুহূর্ত শিশুকে খুঁজে পেতে কাজে লাগাতে হবে। এক্ষেত্রে নিখোঁজ শিশুর তথ্য জানাতে বা অ্যালার্ট ইস্যু করতে মুন অ্যালার্টের হটলাইন (১৩২১৯) ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

পাশাপাশি শিশুর বিস্তারিত তথ্য দ্রুত পুলিশকে অবহিত করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে থানায় যাওয়া এবং বাংলাদেশের পুলিশের জরুরি নম্বর ৯৯৯ এ কল করে পুলিশকে অবহিত করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, দ্রুত স্থানীয় থানায় গিয়ে শিশুর বিস্তারিত তথ্য-সহ জিডি করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘কারো সাথে পূর্ব-শত্রুতা থাকলে বা সন্দেহভাজন কেউ থাকলে অভিভাবকের উচিত সেটি পুলিশকে অবহিত করা। পাশাপাশি আগের কোনো শত্রুতা বা হুমকি থাকলে তাও পুলিশকে জানাতে হবে।’

পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, বর্তমানে অনলাইন জিডি সুবিধা চালুর ফলে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০।

যদিও সাদাত রহমান বলছেন, নিখোঁজের ক্ষেত্রে অনলাইনে জিডি করার সুবিধা কাজ করে না। এ ধরনের জিডি করতে ভুক্তভোগী পরিবারকে থানায় যেতে হয়।

আশপাশে সন্ধান চালানো
চলতি মাসের শুরুতে পুলিশ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জায় বা ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব কাজ করে।

সাদাত রহমান বলছেন, স্কুলের বাচ্চারা নিখোঁজ হলে শুরুতেই তাদের কোনো বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গেলো কি না তার খোঁজ নিতে হবে। ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এটি ঘটে এবং তাদের অনেককে পরে পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘এছাড়া ছোটো শিশুর ক্ষেত্রে বাড়ির আশপাশের ডোবা নালাসহ বিপজ্জনক জায়গাগুলো ভালো করে দেখতে হবে। বাচ্চারা অনেক সময় পছন্দের ব্যক্তিদের কাছে যায়। এমন কারো কাছে গিয়েছে কি-না সেটি নিশ্চিত হতে হবে। কনস্ট্রাকশন সাইট কিংবা মাঠ থাকলে সেগুলোতে সন্ধান করতে হবে।’

সাদাত রহমান বলেন, কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অনেকের বাসা থেকে রাগ করে বা পড়াশোনার ভয়ে বের হয়ে যাওয়ার উদাহরণও আছে।

আইনজীবী মিতি সানজানা বলছেন, শিশুটি সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা করা যাবে এমন প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে কোনো বিলম্ব না করে এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে জানাতে হবে।

আরো যেসব জায়গায় খোঁজ নিতে হবে
শিশুটি কোথায় যেতে পারে- সেই সম্ভাবনা ধরে কাছাকাছি থাকা হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে খোঁজ নেয়া যেতে পারে।

শিশুর নিয়মিত যাতায়াতের জায়গাগুলোতে ভালো করে সন্ধান চালাতে হবে।

নিখোঁজ বা হারিয়ে যাওয়া শিশু পেলে অনেক সময় আদালতের মাধ্যমে সরকারি শিশু সদনে রাখে পুলিশ। শিশুটি সেখানে আছে কি-না সেই খোঁজের জন্য আদালতের নন-এফআইআর শাখায় খোঁজ নিতে হবে।

শিশুকে শেখান
সাদাত রহমান বলছেন, অনেক সময় শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর লোকজন পেলেও কোনো তথ্য দিতে পারে না। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে মোবাইল নম্বর মুখস্থ করানোর চেষ্টা করতে হবে।

একইসাথে শিশুকে অপরিচিতদের কাছে না যাওয়ার বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, ‘পিতামাতাসহ পরিবারের অভিভাবকদের শিশুদের প্রতি আরো দৃষ্টি দিতে হবে। তারা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।’

মিতি সানজানাও বলছেন, বয়সের সাথে সাথে শিশুকে সচেতন করে তুলতে হবে অভিভাবকদেরই।
সূত্র : বিবিসি