রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফাইল ছবি

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী নভেম্বরেই প্রথম ইউনিটের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে আশা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

Advertisement

এদিকে, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আরো ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় তিনটি লরিতে করে জ্বালানির চালানটি প্রকল্প এলাকায় নেয়া হয়। 

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাশিয়া থেকে ভারতের দিল্লি হয়ে জ্বালানিবাহী উড়োজাহাজটি সোমবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। আভিয়াকন জিতোট্রান্স পরিচালিত এজেডএস-৬৭১৩ ফ্লাইটে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি আনা হয়। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জ্বালানি বুঝে নেন।

আজ মঙ্গলবার সকালে জ্বালানিবাহী তিনটি লরি ঢাকা থেকে রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে। সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে নাটোরের বনপাড়া ও পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া হয়ে লরিগুলো প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়। পথে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি এসআরবি ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।

পুলিশ ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জ্বালানি পরিবহনের সময় সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যানজট এড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ সময় মহাসড়কে সাময়িকভাবে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সাতটি কার্গোতে মোট ১৬৩টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটে জ্বালানি পুনঃস্থাপনের জন্য দুটি কার্গোতে আরো ৪৮টি ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বলি আনা হবে। সর্বশেষ চালানটি দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহের তৃতীয় চালান। আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে রাশিয়া থেকে আরো সাতটি ফ্লাইটে ইউরেনিয়ামের চালান বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। 

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম জানিয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে।

এর আগে ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রূপপুরের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি দেশে পৌঁছায়। ওই বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে আরো চারটি চালানে জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় নেয়া হয়। চলতি বছরের মে মাসে প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। পরে নিয়মিত জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানির একটি চালান গত ৩ অক্টোবর রূপপুরে আনা হয়। সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর দ্বিতীয় ইউনিটের দ্বিতীয় চালানের জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায়।

চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছর রাশিয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ করবে। এরপর নির্ধারিত সময় পরপর জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশকে তা আমদানি করতে হবে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

এদিকে, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি স্থাপনের কাজ শেষ হলেও বিভিন্ন কারিগরি জটিলতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময়সূচি পিছিয়েছে। স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমনব্যবস্থার নিরাপত্তা ভালভে ত্রুটি দেখা দেয়ায় চলতি মাসে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভালভটির তৃতীয় দফার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনক্রমে ১১ অক্টোবর চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করা হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহে প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে ইউনিটটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘স্টেজ-সি’ বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপে’ প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সম্পন্ন হলে আগামী নভেম্বরেই প্রথম ইউনিটের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। একইসাথে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।