সাজেক, অবরোধ, বৈঠক
অবরোধকারীদের সাথে বৈঠক করেছে সরকার পক্ষ। নয়া দিগন্ত

সাজেক অবরোধকারী দু’টি সংগঠনের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া। আলোচনা চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, বাকি একটি দাবি নিয়েও আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

Advertisement

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে সাজেকের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

এর আগে সাজেকের উজো বাজারে সরকারি প্রতিনিধি দলের সাথে অবরোধকারীদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক হয়। বৈঠকে চলমান সঙ্কট নিরসনে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

ব্রিফিংয়ে ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘ওদের যে পাঁচটি দাবি ছিল, প্রায় চারটিতে সমঝোতা হয়েছে। রাত হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা আলোচনা কন্টিনিউ করতে পারিনি। দুয়েক দিনের মধ্যে বাকি পয়েন্টে আলোচনা করে একটি সমাধানের দিকে যাওয়া যাবে। সহসাই রাস্তা ওপেন হবে। অবরোধ উঠে যাবে। এটাই আমাদের বিশ্বাস। ওদের সাথে এখনো আলোচনা চলমান রয়েছে।’

পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা কার্যক্রম করছি। তিনি অত্যন্ত আন্তরিক।’

এসময় সকল অবৈধ সশস্ত্র সংগঠনের বিষয়ে সরকার ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান ওয়াদুদ ভূঁইয়া।

রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘তাদের সাথে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। কিন্তু একটি পয়েন্ট অমীমাংসিত আছে। আশা করি, এটিও দ্রুত সমাধান হবে। আমরা আশাবাদী।’

প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো: আনোয়ার সাদাত, রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো: মোর্তোজা আলী খান, রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিবসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা।

এদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় সাজেক গণআধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব বিজয় কান্তি চাকমা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে অনুষ্ঠিত সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের সাথে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। সরকারি প্রতিনিধি দল সশস্ত্র সন্তু গ্রুপকে সরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’

যা রয়েছে দুই সংগঠনের পাঁচ দফা লিখিত দাবিতে 
১। ক) গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে।
খ) হামলায় নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে বাঘাইহাট জোনের উপঅধিনায়ক মেজর মো: সালমান সিদ্দিক এবং মাচালং ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন খন্দকার মেহেদী হাসানকে শাস্তি প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করতে হবে।
গ) গোলাগুলির মিথ্যা নাটক সাজিয়ে ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো এক হাজার জনকে আসামি করে দায়ের করা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
ঘ) ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।

২। উজো বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একইসাথে উজো বাজার থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের প্রত্যাহার করতে হবে।

৩। সেনাবাহিনীর মারধরে আহত নারী-পুরুষের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করতে হবে।

৪। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সাজেকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে অভিযোগ করা জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে সাজেক থেকে সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে হবে।

৫। আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গ্রেফতার ও হয়রানি করা যাবে না। একইসাথে তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

গণ অধিকার রক্ষা কমিটির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, উজো বাজারের বৈঠকে তাদের অন্যতম দাবি সশস্ত্র সন্তু গ্রুপকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দল কর্তৃক প্রতিশ্রুতি দিতে না পারায় সমঝোতা হয়নি। তবে পুনরায় বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, সাজেকবাসীর প্রতিনিধিদলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের উষাতন চাকমা, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির জিকো চাকমা ও সাজেক নারী সমাজের সদস্য সাধনা দেবী চাকমা।

অপরদিকে সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো: আনোয়ার সাদাত, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো: মোর্তজা আলী খান ও রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মো: আব্দুর রকিব।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, আলোচনায় সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র দলের সদস্যদেরকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেয়ার দাবির প্রেক্ষিতে সরকারি প্রতিনিধি দল তাদেরকে সরিয়ে নিতে তিন সপ্তাহ সময় চায়। তবে দুই সংগঠনের নেতারা তাতে রাজী হননি, তারা সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানান। অবশ্য উক্ত সময়ে তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হলে প্রয়োজনে সময় বাড়ানো যাবে বলে তারা জানিয়ে দেন।

বৈঠকে দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় দুই সংগঠন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

উল্লেখ্য, সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা তৃতীয় দফার অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের কারণে টানা পাঁচ দিন ধরে অবরুদ্ধ রয়েছে সাজেক। হাট-বাজার বন্ধ থাকায় মারাত্মক ভোগান্তিতে রয়েছে স্থানীয় জনগণ। অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।