কোরআন নিয়ে কটূক্তি
অভিযুক্ত সৌরভ দাস, ঘরের বেড়া ভাঙচুর উত্তেজিত জনতার (বাঁ দিক থেকে)। নয়া দিগন্ত

রংপুরে ফেসবুকে এক হিন্দু যুবক সৌরভ দাস কর্তৃক আল্লাহ ও কোরআন শরীফকে ব্যঙ্গ করে ভিডিও পোস্টের জেরে তার বাড়ির তিনটি ঘরের বেড়া ভাঙচুর করেছে উত্তেজিত জনতা।

Advertisement

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৮টায় পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চক করিম তেলিপাড়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। 

পুলিশ জানায়, ওই গ্রামের বিশু চন্দ্র মহন্তের ছেলে পোশাক শ্রমিক সৌরভ চন্দ্র মহন্ত কয়েক দিন আগে আল্লাহ এবং কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও বানিয়ে তা তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে ছড়িয়ে দেয়।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা সৌরভ চন্দ্র, দীনেশ চন্দ্র ও জগদীশ চন্দ্র মহন্তের বাড়ির তিনটি ঘরের বেড়ায় ভাঙচুর চালায় এবং ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে। পরে সেখানে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

খবর শুনে সেখানে রাতেই উপস্থিত হন পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জগদীশ চন্দ্র মহন্ত বলেন, ‘সন্ধ্যার পর রাস্তায় তো অনেক লোক ছিল। তারা বাধা দিতে গিয়েছিল, কিন্তু তাদের বাধা দিতে দেয়নি। আমার পাকের ঘর ও ছাগলের ঘর ভাঙচুর করেছে। হঠাৎ ৫০-৬০ জন মানুষ এসে ভাঙচুর করে। কারেন্ট না থাকায় আমরা তাদের চিনতে পারি নাই।’

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দীনেশ চন্দ্র মহন্ত জানান, ‘আমার ঘরের সম্পূর্ণ জিনিস এলোমেলো ও ভাঙচুর করেছে। টিভি এবং বেড়ার টিন ভাঙচুর করে ফেলে দিয়েছে। আর তিনটা খাসির বাচ্চা ছিল, সেটাও নিয়ে গেছে।’

ঘটনা প্রসঙ্গে পীরগঞ্জ থানার ওসি নাজমুল হক জানান, ‘সৌরভসহ আরও দুজনের বাড়ির তিনটি ঘর ও তিনটি রান্নাঘর রয়েছে। হামলায় ঘরগুলো পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। ঘরের টিনের বেড়ায় আঘাত করা হয়েছে, এতে টিন কেটে গেছে। ঘরের ভেতরে থাকা দুটি টেলিভিশন ভেঙে গেছে এবং অন্যান্য মালামাল এলোমেলো করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়িঘর পুরোপুরি ভেঙে ফেলার যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়।’

ওসি আরো জানান, ‘সৌরভ চন্দ্র (২২) নামে গাজীপুরে কর্মরত এক পোশাক শ্রমিক দুই মাস আগে ফেসবুকে পবিত্র কোরআন শরীফ ও আল্লাহকে নিয়ে গালিগালাজ করে একটি পোস্ট দিয়েছিল। ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে গাজীপুরে ব্যাপক ঝামেলা হয়। এ নিয়ে পরে তিনি সেখান থেকে গ্রামের বাড়ি পীরগঞ্জের চক করিম তেলিপাড়া চলে আসেন। পোস্টটি মুছে ফেলার পাশাপাশি নিজের ফেসবুক পেজটি নিষ্ক্রিয় করে দেন।’

ওসি জানান, ‘সপ্তমীর দিনে আবারো পোস্টটির কনটেন্ট কপি করে অনেকে শর্টস ও রিঅ্যাকশন ভিডিও আকারে ছড়িয়ে দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ ঘটনার জেরে আমরা খবর পাই স্থানীয় লোকজন তার বাবার বাড়িতে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই বিকেলে এলাকায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনদের সাথে কথা বলি। তারা আমাদের কোনো ঝামেলা না হওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। এরপরও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চারজন পুলিশ সদস্যকে সাদা পোশাকে এবং পাঁচ-ছয়জন সোর্সকে সেখানে রেখে আসি। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হওয়ায় তাদের চলে আসতে বলা হয়। পরে তারা চলে আসেন। আমি মাগরিবের পর সেখান থেকে আসি। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে ওই সময় বাড়িটিতে হামলার ঘটনা ঘটে।’

ওসি জানান, ‘ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। মামলা হলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক জানান, ‘আইন হাতে তুলে নিয়ে কোনো বাড়িঘর ভাঙচুর করা বা কোনো ধরনের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হোক বা এর প্রেক্ষাপটে কোনো বাড়িঘরে আঘাত করা হোক—এটা অবশ্যই আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব।’

এসপি জানান, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে ইনকোয়ারি করছি এবং কিছু নাম পাচ্ছি। আমরা বিষয়টা যাচাই-বাছাই করছি এবং এটি কঠোর হাতে মোকাবিলা করব। আইনগতভাবে মোকাবিলা করব, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’