চুমু দেয়ার অভিযোগ
টঙ্গী পশ্চিম থানা, গাজীপুর। নয়া দিগন্ত

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পশ্চিম থানার আউচপাড়ায় একটি মাদরাসার প্রথম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে শিক্ষক কর্তৃক চুমু দেয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক ও তোলপাড়। কোনো প্রকার সিসিটিভি ফুটেজ বা বাস্তবিক প্রমাণ সংগ্রহের আগেই পুলিশের ‘অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার’ দাবি এবং ওসির দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আলেম-ওলামা, আইনজ্ঞ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।

Advertisement

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, এক অভিভাবক তার শিশু সন্তানকে মাদরাসার শিক্ষক কর্তৃক চুমু দেয়ার অভিযোগ আনেন। তবে অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ শ্রেণিকক্ষ বা সংশ্লিষ্ট স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ না করেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়।

সংবাদমাধ্যমে টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘চুমু দিলে কি কেউ প্রমাণ রেখে দেয়? এসব যারা করেন গোপনেই প্রমাণ না রেখেই করেন। মেয়েটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে, তাতে সে চুমু দেয়ার কথা বলেছে।’

ওসির এমন সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর রোববার দুপুরে তড়িঘড়ি করে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের জন্য মাদরাসার কম্পিউটার সামগ্রী জব্দ করে পুলিশ।

জবানবন্দির আইনগত ভিত্তি ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে মাদরাসাটির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট শরিফুল আলম এই অভিযোগের আইনি দুর্বলতা তুলে ধরে বলেন, ‘শিশুটি জবানবন্দিতে কী বলেছে তা আমরা এখনো পাইনি, তবে কেবল জবানবন্দির ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। ওই অভিভাবকের অভিযোগের আইনগত কোনো ভিত্তি আমরা দেখছি না।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘অভিযোগকারী অভিভাবক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একেক সময় একেক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা আলেম সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েই এখন জনমনে চরম প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’

মাদরাসার অধ্যক্ষ মো: আলমাছ হোসেন অভিযোগটি ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আমরা সব সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করেছি। কোথাও চুমু দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত শিক্ষকও এমন কাজ স্বীকার করেননি।’

তিনি জানান, ফলাফল ভালো করলে ‘পাপ্পি দেবো’ বলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতেন যা অন্য শিক্ষকরাও নিশ্চিত করেছেন। বাস্তবে চুমু দেয়ার উদ্দেশ্যে এমন কথা বলা হয়নি।

ওসির আগাম ও বিতর্কিত বক্তব্যের সমালোচনা করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘বাস্তব তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই থানার একজন ওসির এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত সন্দেহজনক। এটি মাদরাসা শিক্ষার প্রতি মানুষের অনীহা তৈরির কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।’ 

তবে নিরপেক্ষ তদন্তে শিক্ষক দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট জানান।

অভিভাবকের বক্তব্য বদল ও রহস্যজনক অন্তর্ধান

মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে, ওই অভিভাবকের অভিযোগে চরম অসঙ্গতি রয়েছে। প্রথমে তিনি দাবি করেছিলেন শিক্ষক ‘চুমু খেতে চেয়েছেন’, পরে সাংবাদিকদের বলেন ‘চুমু খেয়েছেন’ এবং ভয়ে শিশুটি ৩ দিন মাদরাসায় যায়নি। অথচ সিসিটিভি ফুটেজ ও হাজিরা খাতায় দেখা যায়, শিশুটি প্রতিদিনই ক্লাসে এসেছে এবং স্বাভাবিক খেলাধুলা করেছে।

পরবর্তীতে শ্রেণিকক্ষের ফুটেজ ফাঁসে নিজের দাবি টিকবে না দেখে অভিভাবক নতুন করে সিঁড়িতে জড়িয়ে ধরে চুমু দেয়ার অভিযোগ তোলেন। কিন্তু মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, শ্রেণিকক্ষ ও সিঁড়ির সিসিটিভির কোথাও জড়িয়ে ধরা বা চুমু দেয়ার কোনো আলামত নেই।

এদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযোগকারী অভিভাবক শাহজালাল রুমি রহস্যজনকভাবে আত্মগোপনে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়েছে। টঙ্গীতে তার স্ত্রী ও সন্তানের বসবাসের স্থানটি বর্তমানে তালাবদ্ধ। 

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, প্রায় তিন বছর আগে ছাড়াছাড়ি হলেও রুমি সেখানে যাতায়াত করতেন এবং বসুন্ধরা এলাকায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী রয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে ও মিথ্যা অভিযোগ ফাঁস হওয়ার ভয়ে তিনি পালিয়েছেন বলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। 

যদিও তার ভাগিনা ইসমাইল হোসেন রানা দাবি করেছেন, রুমি কোথায় আছেন তা তাদের জানা নেই। বসুন্ধরায় রুমির দ্বিতীয় স্ত্রী আছে কি না এটাও তার জানা নেই দাবি করে বলেন, ‘রুমির প্রথম স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়াসহ যেসব কথা প্রচার হচ্ছে তা মিথ্যা।’

ওসির আত্মপক্ষ সমর্থন ও এআই প্রযুক্তির দাবি

তদন্তাধীন বিষয়ে আগাম মন্তব্য করে বিতর্কের মুখে পড়া টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান তার বক্তব্যের দ্বিমত পোষণ করেছেন। 

তিনি দাবি করেন, গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যটি এআই প্রযুক্তি দিয়ে বানিয়ে প্রচার করা হয়ে থাকতে পারে। 

তিনি বলেন, ‘আমি সাক্ষাৎকারে কী বলেছি তার ভিডিও আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। যে কেউ থানায় এসে তা দেখে যেতে পারেন।’

তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই পুলিশের ঢালাও মন্তব্য এবং মূল তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সচেতন মহলে চরম ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।