
গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় ক্বারীউল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে সৃষ্ট ঘটনায় নতুন বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমির অভিযোগ, মাদরাসার শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন তার মেয়েকে চুমু দিয়েছেন। তবে শিক্ষক শিশুটিকে চুমু দিয়েছেন—এমন বাস্তব প্রমাণ পুলিশের হাতে আসেনি বলে জানিয়েছেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান।
অন্যদিকে শিক্ষককে মারধর ও মাদরাসায় ভাঙচুরের একাধিক ভিডিও ফুটেজ পুলিশ জব্দ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার মাদরাসার শিক্ষক মোসলেম উদ্দিনের জামিন আবেদন রোববার (২৫ অক্টোবর) নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
এদিকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন আলেম-ওলামারা। তারা দুই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও মাদরাসায় হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক ওমর হায়দার শিক্ষকের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মহিউদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, আসামি জামিনে মুক্তি পেলে তদন্তকাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—শুনানিতে তারা এ যুক্তি তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী শরিফুল আলম বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো মামলা নেই এবং অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই বলে তারা আদালতে যুক্তি দিয়েছেন।
চুমু দেয়ার প্রমাণ নেই: পুলিশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমিকে বলতে শোনা যায়, শিক্ষক তার মেয়েকে চুমু দিতে চেয়েছিলেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি শিক্ষক শিশুটিকে চুমু দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
তার দাবি, মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদরাসায় গিয়েছিলেন, কোনো মব সৃষ্টি করতে নয়। ঘটনার বিষয়ে আগেই অধ্যক্ষকে জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, তার বক্তব্যের ভিডিও কেটে প্রচার করে ‘অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে’ বলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, মেয়েটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে শিক্ষক তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দেয়ার কথা বলেছে। ইহা ছাড়া আমার কাছে অভিযোগের অন্য কোনো প্রমাণ রয়েছে—এ কথা আমি বলিনি।’
মাদরাসার সিসিটিভি ফুটেজে কথিত চুমু দেয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, এ ধরনের কোনো নথি বা প্রমাণ এখনো তাদের হাতে আসেনি। তবে শিক্ষককে মারধর ও মাদরাসায় ভাঙচুরের একাধিক ভিডিও ফুটেজ পুলিশ জব্দ করেছে বলে জানান তিনি।
অধ্যক্ষের বক্তব্য: চুমু নয়, উৎসাহ দিতে বলেছিলেন
মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ ক্বারী আলমাছ হোসেন গাজীপুরীর দাবি, শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করার জন্য উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, যারা ভালো ফল করবে, তাদের ‘পাপ্পি’ দেবেন। কিন্তু তিনি কোনো শিক্ষার্থীকে চুমু দেননি। অন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি এমনটাই জেনেছেন বলে জানান অধ্যক্ষ।
তার ভাষ্য, এক ছাত্রীর মা বিষয়টি নিয়ে মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপালকে ফোন করেছিলেন। তবে তাকে (অধ্যক্ষকে) সরাসরি লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ জানানো হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ না দিয়েই অভিভাবক লোকজন নিয়ে মাদরাসায় হামলা চালান বলে দাবি করেন তিনি।
অধ্যক্ষ আরো বলেন, শিশুটি ঘটনার পর তিন দিন মাদরাসায় আসেনি বলে তার বাবা যে দাবি করেছেন, তা সঠিক নয়। বরং ওই তিন দিনই শিশুটি ক্লাসে এসেছে এবং স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা ও খেলাধুলা করেছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে বলেও জানান অধ্যক্ষ।
শিক্ষককে মারধর, বৃদ্ধ নিরাপত্তাকর্মীও আহত
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২১ অক্টোবর শাহজালাল রুমি লোকজন নিয়ে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে শিক্ষক মোসলেম উদ্দিনের ওপর হামলা চালান। এতে তার মাথা ফেটে যায়। অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীরাও মারধর ও লাঞ্ছনার শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি একজন নারী শিক্ষিকাকেও মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন অধ্যক্ষ।
মাদরাসার নিরাপত্তাকর্মী দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারীর দাবি, হামলায় তিনিও আহত হয়েছেন এবং আঘাতের কারণে বর্তমানে এক চোখে ঠিকমতো দেখতে পারছেন না। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তার বয়স প্রায় ৬০ বছর।
অধ্যক্ষ আরো অভিযোগ করেন, তার কার্যালয়ের ড্রয়ারে জমি কেনার জন্য রাখা ১৭ লাখ টাকাও লুট হয়েছে। তবে শাহজালাল রুমি এ অভিযোগ অস্বীকার করে সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলেমদের ক্ষোভ
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মাদরাসা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে আলেম-ওলামারা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের অভিযোগ, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি। বরং আহত শিক্ষককে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটক করা হয়েছে এবং মাদরাসায় হামলার অভিযোগে মামলা নিতে বিলম্ব করা হয়েছে।
তাদের দাবি, শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও এখনো অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়নি।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, কথিত যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষক ও মাদরাসাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের মতে, একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগের দায় পুরো মাদরাসা শিক্ষা ও আলেম-ওলামাদের ওপর চাপানো অনুচিত। তারা দুই মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে জিএমপি কমিশনার মো: ইসরাইল হাওলাদার বলেন, উভয় মামলা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশের প্রতি সন্দেহ বা আস্থাহীনতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গুজব ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান কমিশনার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি প্রচারণা
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ শিশুর নিরাপত্তা ও অভিযোগের বিচার দাবি করছেন, আবার কেউ মাদরাসায় হামলা ও শিক্ষককে মারধরের বিচার চাইছেন। কিছু পোস্টে মাদরাসা শিক্ষা ও আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে সাধারণীকরণমূলক মন্তব্য করা হয়েছে। অন্যদিকে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সমর্থকদের কেউ কেউ ওই অভিভাবকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ঘটনাটিকে পরিকল্পিত প্রচারণা বলে দাবি করেছেন।
অধ্যক্ষের দাবি, শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন মাদরাসায় খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন এবং একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে অনার্সের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। তিনি দিনে প্রায় তিন ঘণ্টা ক্লাস নেন। ঘটনার সময় মাদরাসার উপাধ্যক্ষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে ছিলেন বলেও জানান অধ্যক্ষ। অথচ এই মোসলেম উদ্দিনকেই উপাধ্যক্ষ হিসেবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
এ ঘটনায় একদিকে শিশুটির অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অন্যদিকে শিক্ষককে মারধর, মাদরাসায় ভাঙচুর ও অর্থ লুটের অভিযোগের তদন্ত—দুটি বিষয়ই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বক্তব্যের পরিবর্তে সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দ করা ভিডিও, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








